Opu Hasnat

আজ ১৭ ডিসেম্বর সোমবার ২০১৮,

ঝালকাঠিতে ২ বিচারক হত্যা দিবস আজ

স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণ ও ক্ষতিগ্রস্ত গাড়িটি মিউজিয়ামে সংরক্ষণ ঝালকাঠি

স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণ ও ক্ষতিগ্রস্ত  গাড়িটি মিউজিয়ামে সংরক্ষণ

২০০৫ সনের ১৪ নভেম্বর জেএমবির বোমা হামলায় নিহত হওয়া ঝালকাঠিতে দুই বিচারক বহনকারী মাইক্রোবাসটি সংরক্ষণের কাজ এবং দুর্ঘনার স্থানটিতে স্মৃতি ফলক নির্মাণের কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবন চত্ত¡রে দৃষ্টিনন্দন  মিউজিয়াম এবং পূর্ব চাঁদকাঠি এবাদুল্লাহ জামে মসজিদের সামনে সরকারী কোয়ার্টারে প্রবেশ পথে বোমা হামলার  স্থানে স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। ঝালকাঠি জজ আদালতের জেলা ও দায়রা জজ মো. ইখতিয়ারুল ইসলাম মল্লিকের প্রচেষ্টায় এই নির্মম ও জঘন্যতম হামলার একমাত্র এই স্মৃতি সংরক্ষণ করা হয়েছে। ১৪ নভেম্বর বুধবার সকালে মিউজিয়াম ও স্মৃতি ফলকের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন জেলা ও দায়রা জজ মোঃ ইখতিয়ারুল ইসলাম মল্লিক। ঝালকাঠিসহ দেশবাসীর কাছে এই উদ্যোগ প্রশংসনীয় হয়ে থাকবে। সেই সঙ্গে এটি সেদিনের ঘটনার স্বাক্ষী হয়ে থাকবে এবং দর্শনার্থীদের অনেক প্রশ্নের জবাব মিলবে মিউজিয়ামের এই গাড়িটি ও স্মৃতিস্তম্ভ দেখে।

জেলা জজশিপের প্রবেশ দ্বারে জেএমবির শক্তিশালী বোমায় বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়া এই গাড়িটির সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে ঝালকাঠি পৌরসভা এবং স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণের কাজ বাস্তবায়ন করেছে ঝালকাঠি গণপূর্ত অধিদপ্তর। যা দেখে সবাইকে মনে করিয়ে দেয় জেএমবির বোমার আঘাত কতটা নির্মম ও শক্তিশালী ছিল। সেই সাথে মনে করিয়ে দেয় নিরীহ শহীদ দুই বিচারক সোহেল আহমেদ ও জগন্নাথ পাড়ের অনাকাঙ্খিত মৃত্যুকে।

পৌর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, গাড়িটির এই মিউজিয়াম প্রকল্পটি বাস্তবায়নে খরচ হয়েছে ৬ লাখ ১০ হাজার টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে এর কাজ শেষ হয়েছে। থাই কাঁচের গøাস, রঙ্গিন টিন, এসএস পাইপ ও টাইলস দিয়ে ১৮ ফুট লম্বা এবং  ১২ ফুট চওড়া এই মিউজিয়ামটি তৈরি করা হয়। ঝালকাঠি গণপূর্ত অধিদপ্তরের সহায়তায় বোমা হামলার দুর্ঘটনার স্থানে পাথরে খোদাই করে প্রায়াত বিচারকদ্বয়ের ছবি, টাইলস ও এসএস পাইপ দিয়ে স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। 

২০০৫ সালের ১৪ নভেম্বর দিনটি ছিল সোমবার। সকাল ৮ টার দিকে আমার দোকানে এসে এক লোক রুটি কলা খেয়ে ঝালকাঠিতে থাকার হোটেল আছে কিনা জানতে চায়। শহরের মধ্যে হোটেল আছে বলে তাকে জানানো হয়। কিছুক্ষণ পরে সকাল ৯ টার দিকে বিকট একটি শব্দ হয়। থাকে সাজানো দোকানের মালামাল পড়ে এলোমেলো হয়ে যায়। মাংস পোড়া গন্ধ আসতে শুরু করে। কাকগুলো মাংস পোড়া গন্ধ পেয়ে ডাকাডাকি করতে থাকে। চারিদিকে হৈ চৈ পড়ে যায়। দৌড়ে গিয়ে দেখি বিধ্বস্ত গাড়ি, ৩ জন লোক গুরুতর আহত অবস্থায় রয়েছে। তাদেরকে উদ্ধার করলে ঘটনাস্থলেই ক্ষতবিক্ষত ১জনকে মৃতাবস্থায় পাওয়া যায়। বাকি ২ জনকে উদ্ধার করে সদর হাসপাতালে  নেয়া হয়। তখন চিনতে পারি এদের মধ্যে ২ জন ঝালকাঠির বিচারক এবং আমার দোকান থেকে অপরজন রুটি কলা ক্রেতা ঘাতক মামুন। কথাগুলো বললেন প্রত্যক্ষদর্শী পূর্ব চাঁদকাঠি এবাদুল্লাহ জামে মসজিদ সংলগ্ন তৎকালীন ব্যবসায়ী ও কলেজ ছাত্র জোবায়ের হোসেন। বর্তমানে সে ঝালকাঠি শহর ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন। 

তথ্যানুসন্ধানে জানাগেছে, ১৪ নভেম্বর সকাল ৯ টার দিকে পূর্ব চাঁদকাঠি সরকারি বাসা থেকে ঝালকাঠি আদালতের সহকারী বিচারক সোহেল আহমেদ ও জগন্নাথ পাড়ে কর্মস্থলে যাবার পথে তাদের বহনকারী মাইক্রোবাস অপর বিচারক আউয়াল হোসেনের বাসার সামনে অপেক্ষা করতে থাকে। এসময় জেএমবি সুইসাইড স্কোয়াডের সদস্য ইফতেখার হাসান আল মামুন তাদেরকে একটি লিফলেট পড়তে দিলে তারা বিব্রতবোধ করে ফিরিয়ে দেয়। ইতিমধ্যে মামুন তাদেরকে লক্ষ করে বোমা ছুঁড়লে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে গোটা ঝালকাঠি শহর। ঘটনাস্থলেই মারা যান বিচারক সিনিয়র সহকারী জজ সোহেল আহম্মেদ এবং গুরুতর আহত অবস্থায় বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে মৃত্যু হয় অপর বিচারক সিনিয়র সহকারী জজ জগন্নাথ পাঁড়ের। এ সময় তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসটি বিধ্বস্ত হয়। আহত অবস্থায় ধরা পড়ে হামলাকারী, জেএমবি সুইসাইড স্কোয়াডের সদস্য ইফতেখার হাসান আল মামুন। সারাদেশের মানুষ এ ঘটনায় হতবাক হয়ে যান। এরপর পর্যায়ক্রমে জেএমবির শীর্ষ নেতারা আটক হয়। জঙ্গিদের ঝালকাঠিতে এনে তাদের উপস্থিতিতে জেলা জজ আদালতে চাঞ্চল্যকর এ মামলার বিচারকার্য চলে। তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ রেজা তারিক আহমেদ ২০০৬ সালের ২৯ মে এজাহার ভুক্ত আসামি সুলতানকে বাদ দিয়ে ৭ জনকে ফাঁসির আদেশ দেন। উচ্চ আদালতে সে রায় বহালের পর দেশের বিভিন্ন জেলখানায় ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ ৬ শীর্ষ জঙ্গির মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। এরা হলেন- জেএমবি প্রধান শায়খ আবদুর রহমান, সেকেন্ড ইন কমান্ড সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলাভাই, সামরিক শাখা প্রধান আতাউর রহমান সানি, উত্তরাঞ্চলীয় সমন্বয়কারী আবদুল আউয়াল, দক্ষিণাঞ্চলীয় সমন্বয়কারী খালেদ সাইফুল্ল¬াহ ও বোমা হামলাকারী ইফতেখার হাসান আল মামুন। সর্বশেষ অন্য সাজাপ্রাপ্ত আসাদুল ইসলাম আরিফের ২০১৫ সালের ১৬ অক্টোবর রাতে খুলনার কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়েছে। ২৯ মার্চ শীর্ষ জঙ্গিদের ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার ২০ দিন পর মামলা পরিচালনাকারী তৎকালীন সরকারি কৌসুঁলী হায়দার হোসেনকে ২০০৭ সালের ১১ এপ্রিল এশার নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে বের হওয়ার পরক্ষনেই মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। 

ঝালকাঠি জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও পিপি অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান রসুল জানান, নিহত বিচারকদ্বয়ের স্মরণে তাদের নামে জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবনের হলরুমটির নামকরণ করা হয়। জেলা ও দায়রা জজ মোঃ ইখতিয়ারুল ইসলাম মল্লিক’র উদ্যোগে স্মৃতিস্তম্ভ এবং ক্ষতিগ্রস্ত গাড়িটি সংরক্ষণে মিউজিয়াম নির্মাণ করা হয়েছে। তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বুধবার সকাল সাড়ে ৮ টায় জেলা ও দায়রা জজ আদালত চত্ত¡রে নবনির্মিত মিউজিয়ামের ভিত্তিফল উম্মোচন, শোক র‌্যালী ও ঘটনাস্থলে নির্মিত স্মৃতি স্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও দোয়া-মোনাজাতের আয়োজন করা হয়েছে। বিকেলে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সোহেল আহম্মেদ ও জগন্নাথ পাঁড়ে হলরুমে দোয়া ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। ঝালকাঠি জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা কাজী মোঃ শামীম জানান, পৌরসভার মেয়র গাড়িটি সংরক্ষণে মিউজিয়াম নির্মাণের ইচ্ছা পোষণ করেন। সে অনুযায়ী আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে মিউজিয়াম নির্মাণের অনুমতি চেয়ে আবেদন করা হয়। মন্ত্রণালয় মিউজিয়াম নির্মাণের অনুমতি দিলে পৌরসভা তা বাস্তবায়ন করে। দুর্ঘটনা কবলিত স্থানটিতে গণপূর্ত অধিদপ্তর স্মৃতিফলক নির্মাণ করেছে। এছাড়াও পূর্ব চাঁদকাঠি কোয়ার্টারের মধ্যের সড়কটি প্রায়াত দু’বিচারকের “শহীদ সোহেল-জগন্নাথ সড়ক” নামে নামকরণের উদ্যোগ পৌরসভা নিয়েছে বলেও জানান তিনি। প্রায়াত জগন্নাথ পাড়ের শ্বশুর মুকুল চন্দ্র মুখার্জি জানান, হত্যাকান্ডের স্মৃতি রক্ষার্থে বিধ্বস্ত গাড়িটি মিউজিয়ামে সংরক্ষণ ও ঘটনাস্থলে স্মৃতিফলক নির্মাণ হয়েছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন তিনি।  ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, আমার মেয়ে পল্লবী মুখার্জি পাড়ে (জগন্নাথ পাড়ের স্ত্রী) অল্পবয়সেই স্বামী হারা হয়েছেন। তাকে ইউনাইটেড কমার্সিয়াল ব্যাংকে চাকরী দেয়া হয়েছে। বরিশালে পদায়ন করে একটি মাত্র পুত্র সন্তান শ্রেষ্ঠ পাড়ে’র পড়াশুনা বেশ চালিয়ে যাচ্ছিলো। তাকে  ফরিদপুরে বদলী করায় বর্তমানে বরিশাল বাসায় থেকে পুত্রের পড়াশোনা, নিজের কর্মস্থলে থাকায় সব মিলিয়ে অমানবিক কষ্ট করে জীবন যাপন করতে হচ্ছে। 


\