Opu Hasnat

আজ ১৯ নভেম্বর সোমবার ২০১৮,

প্রাচীন প্রত্নতত্ব ইদ্রাকপুর কেল্লাকে আড়াল করে বহুতল ভবন নির্মাণ কাজ চলছে মুন্সিগঞ্জ

প্রাচীন প্রত্নতত্ব ইদ্রাকপুর কেল্লাকে আড়াল করে বহুতল ভবন নির্মাণ কাজ চলছে

১৬৬০ সালে নির্মিত মুন্সীগঞ্জ জেলার প্রাচীন প্রত্নতত্ব নিদর্শন ইদ্রাকপুর কেল্লাকে আড়াল করে ভবন ও দোকান পাট নির্মাণ কাজ চলছে। প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে দুর্গটিও জরাজির্ণ হয়ে পড়েছে। প্রত্নতত্ব বিশেষজ্ঞরা বলছেন প্রাচীন প্রত্নতত্ব নিদর্শন ইদ্রাকপুর কেল্লার দুর্গকে আড়াল হয় এমন কোন স্থাপনা এর আশপাশে নির্মান আইনি ভাবে করা যাবেনা। সরেজমিনে দেখা যায়, দুর্গটির পূর্ব-দক্ষিণ পাশ ঘেষে জেলা টেনিস কোর্টের  নতুন একতলা ভবন নির্মান করা হচ্ছে। ভিত্তি প্রস্তর ফলক থেকে জানা যায়, চলতি বছরের ৩ আগষ্ট জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের বাস্তবায়নে  যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম টেনিস কোর্টের আধুনিকায়নের কাজের উদ্বোধন করেন।

কেল্লার উত্তর-পূর্ব পাশে জেলা পরিষদ কর্মচারিদের ছোট ঝুপড়ি ঘর ও ডাকবাংলো। পশ্চিম পাশে এভিজেএম সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের বহুতল ভবন। পূর্ব পাশে মহিলা ক্লাব, নির্মাধীন পাবলিক টয়লেট ও ছোট ছোট ৫-৭টি ছোট-বড় দোকান।

এ সময় দোকানিদের সাথে কথা হলে তারা জানান, বর্তমানে যে যায়গায় জেলা প্রশাসক পার্ক নির্মান করা হয়েছে সেখানে তাদের দোকান ছিল। প্রশাসন সেখান থেকে দোকান ভেঙে দেয়। পরে এখানে দোকান করতে অনুমতি দেন।

এলাকার কয়েকজন স্থানীয়রা জানান, মুন্সীগঞ্জ শহরের পুরাতন কাচারিঘাট, লিচুতলা রাস্তায় দাড়ালেই ঐতিহাসিক ইদ্রাকপুর কেল্লাটি দেখা যেত। কেল্লার পাশ ঘেষে ভবন, বাংলো, ক্লাব, দোকান হওয়ার কারনে এখন আর  আগের মত দেখা যায়না। যদি  নির্মানাধীন টেনিস ক্লাবটির কাজ বন্ধ করা না হয় তবে কেল্লাটি পুরোপুরি ঢাকা পড়ে যাবে। এতে করে আড়াল হয়ে যাবে মুন্সীগঞ্জে তৈরির ইতিহাস।

পর্যটক ও জেলার সুশিল সমাজের অধিকাংশ ব্যক্তিদের অভিমত, এক সময়  মানুষ এক নামেই জানত শহরের লিচুতলা এলাকায় আমাদের ইতিহাস ও ঐতিয্য বহনকারী ইদ্রাকপুর কেল্লাটির অবস্থান। এর পাশে বহুতল ভবন, বাংলো, ক্লাব, দোকান হওয়ার কারনে কেল্লাটি আড়াল হয়ে গেছে। এখন রাস্তা থেকে দুর্গটি খুজেঁ  পাওয়া দুস্কর হয়ে উঠছে।
মূল ফটক দিয়ে কেল্লার ভিতরে প্রবেশ করতেই ছোখে পড়ে ডান ও বামপাশে দুটি ভাঙা পরিত্যাক্ত ঘর। ভিতরে পুকুরটি দুটি ঘাটই ভাঙা। ইদ্রাকপুর কেল্লার পাশে আরো দুটি ভাঙা ঘর। ইদ্রাকপুর কেল্লার অবস্থাও ঝরাজির্ণ। দুর্গের প্রাচীরে চুন-সুড়কি বিভিন্ন স্থান থেকে খসে পড়েছে। দুর্গের গায়ে শেওলা জমেছে। চারদিকের  পরিবেশও অপরিচ্ছন্ন।

এ সময় সার্বিক  বিষয় নিয়ে কথা হয় দুর্গটি  রক্ষণাবেক্ষন ও পরিচর্যার দায়িত্বে থাকা মো. আব্দুল কুদ্দুসের সাথে । কুদ্দুস জানান, তিনি সহ মাত্র তিনজন এই দুর্গটিসহ জেলার মোট চারটি প্রতœ সম্পদের দেখবাল করেন। রাতে পাহারা ও দিনে সাফাইয়ের কাজ করেন । জনবলের অভাবে যতটুকু পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা দরকার, দুর্গটি ততটুকু পরিস্কার রাখতে পারছেন না। তিনি আরো বলেন, দুর্গের সংস্কার, ভিতরে থাকা পুকুরটির ঘাট দুইটির পুনরায় নির্মান করা দরকার। ভিতরে চারটি জরাজির্ণ ঘর আছে সেগুলো এখান থেকে সড়ানোর দরকার। দুর্গের তিনপাশে পাশে স্থাপনা আছে এবং নতুন ভবন নির্মান করে দুর্গটি আড়াল করা হচ্ছে তা প্রত্নতত্ব অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে। তারা ব্যবস্থা নিবেন বলে শুনেছি।

এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতœতত্ব বিভাগের অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, একটি প্রাচীন স্থাপনা সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের জন্য দুটি বিষয় থাকে। একটি  কোরজোন ও  অন্যটি বাফারজোন। বাফারজোন হচ্ছে নিরাপদ দুরুত্ব। যেখান থেকে মানুষ ঘুরে ঘুরে ঐইতিহাসিক স্থাপনার সৌন্দর্য ও স্বাদ নিতে  পারে। এমন দুরুত্বের মধ্যে কোন ভবন নির্মান করা যাবেনা। তিনি মনে করেন, দুর্গের ভেতরে ও বাইরে শৌচাগার, ডাকবাংলো, দোকানপাট, কার্যালয়সহ যেসব স্থাপনা আছে এগুলো সরিয়ে নেওয়া উচিত। কারণ এগুলো দুর্গের সৌন্দর্য বিনষ্ট করছে। নতুন করে টেনিস কোর্টের যে কমপ্লেক্স হচ্ছে তা  কোন মতেই  হওয়া উচিত না।

নির্মানাধীন কমপ্লেক্সের বিষয়ে জেলা প্রশাসক সায়লা ফারজানা জানান, টেনিস মাঠটি অনেক পুরোনো। ইদ্রাকপুর কেল্লার যেমন আমাদের প্রয়োজন আছে, তেমনি খেলোয়ার তৈরি করতে টেনিস কমপ্লেক্সেরও প্রয়োজন আছে। মুন্সীগঞ্জ ছোট একটি জেলা শহর। এখানে যদি একটা স্থাপনার জন্য আরো একটি স্থাপনা নির্মাণ না করি,তাহলে কোথায় করব। ডেভলাপমেন্ট থিওরিতে বলেনা একটা স্থাপনার জন্য আরেকটি স্থাপনা তৈরি করা যাবেনা। তিনি বলেন, ইদ্রাকপুর কেল্লা মোটেও আড়াল করা হয়নি। 

প্রত্নতত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক নির্বাহী প্রকৌশলী রাখি রায় বলেন, কোন মতেই প্রতœ সম্পদ আড়াল করে কোন স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। ইদ্রাকপুর কেল্লার পাশে টেনিস কোর্টের যে নতুন ভবন নির্মান করা হচ্ছে তা আমরা জানতে পেরেছি। নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখতে জেলা প্রশাসককে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এছাড়াও যারা কেল্লাটি আড়াল করে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মান করেছেন

মুন্সীগঞ্জের ইতিহাস থেকে ঐতিয্যবাহী দুর্গটি সম্পর্কে জানা যায়, বার ভূঁইয়াদের দমনের উদ্দেশ্যে এবং রাজধানী ঢাকাকে জলদস্যুদের কবল থেকে রক্ষার জন্য সুবাদার মীর জুমলা ১৬৬০ সালে ইদ্রাকপুর দুর্গ নির্মাণ করেন। ধারণা করা হয়, এ দুর্গকে ঘিরেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে মুন্সীগঞ্জের বসতি। ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের সময় মোগলদের পতন হলে ইদ্রাকপুর দুর্গটি ইংরেজদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। পরবর্তী সময়ে ১৯০৯ সালে ব্রিটিশ ভারতে প্রতœতাত্তি¡ক জরিপ কর্তৃপক্ষ ইদ্রাকপুর দুর্গটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছিল।