Opu Hasnat

আজ ২৪ অক্টোবর বুধবার ২০১৮,

কণ্ঠকে ছাড়িয়ে টুম্পার রূপের জলসায় মজেছে দর্শক! মতামত

কণ্ঠকে ছাড়িয়ে টুম্পার রূপের জলসায় মজেছে দর্শক!

আমরা বাঙালি, জাত বাঙালি। আমরা এমন একটা জাতি যে জাতি প্রতিভার মূল্যায়ন করে একটু ভিন্নভাবে। যেমনটি অনেকটা ‘দেশের ফকির দেশে ভিক্ষা পায় না’- প্রবাদটির ন্যায়। এমনটিই যেন ঘটেছে কিছুদিন আগে দেশজুড়ে প্রবল আলোচিত ‘অপরাধী’ গানের শিল্পী আরমান আলিফের ভাগ্যে! গেলো ২৬ এপ্রিল ঈগল মিউজিকের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত হয়েছিলো অঙ্কুর মাহমুদ ফিচারিং আরমান আলিফের ‘অপরাধী’ গানের ভিডিও ভার্সন। এই সঙ্গীতশিল্পী তার এ আলোচিত গান দিয়ে টেইলর সুইফটকেও পেছনে ফেলে দেন। ফলশ্রুতিতে, আরমান আলিফের নাম সর্বজনশ্রুত হতে লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু এই আরমান আলিফের ‘অপরাধী’ গানটিই কাভার করে লাইমলাইটে চলে আসেন টুম্পা খান নামের বেশ সুদর্শনা এক তরুণী। রাতারাতি জনপ্রিয়তায় আরমান আলিফকেই পেছনে ফেলে দেয় শুধুমাত্র তার গান কাভার করা এই তরুণী। সেই সাথে মিডিয়াও তার সুনামে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। আর হঠাৎ জ্বলে ধপ করে নিভে যাওয়া বাতির ক্ষণিক আলোর মতোই হারিয়ে যেতে থাকে আরমান আলিফের নাম! গানের প্রকৃত শিল্পীর কদর না করে বাঙালিরা কদর করলো মাত্র গানটি কাভার করা এক তরুণীকে। শুধু তরুণী নয়, বেশ সুদর্শনা তরুণী টুম্পা। আর এইটাই কিন্তু মূলত হতে পারে এভাবে টুম্পার আকস্মিক আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা লাভের মোক্ষম অস্ত্র। হতেই পারে, টুম্পা একটু সুন্দর বলেই তার সৌন্দর্যেই মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ছে! প্রকৃতপক্ষে তার কাভার করা গানের কণ্ঠে কিন্তু নয়। এই গানটিই যদি কোনো পুরুষ তার সুললিত কণ্ঠে কাভার করতো কখনোই তা অনেক ভালো হলেও টুম্পার মতো একজন সুদর্শনা নারীর কাছে তা পরাজিত হতোই। অর্থাৎ, টুম্পার কাভার করা গানের কণ্ঠ মানুষকে যতোটা টেনেছে, একজন তরুণী হবার বিষয়টিই তাকে আরও মানুষের কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। আমাদের মধ্যে এমন অনেক বাঙালি রয়েছেন যারা কর্মে নয়, নামে বিশ্বাসী। তেমনি এক্ষেত্রেও শ্রোতারা টুম্পার কণ্ঠে নয়, সত্যিকার অর্থে টুম্পার চেহারাতেই মজেছে! আর এইটাই প্রকৃত সত্য বলে আমার কাছে মনে হয়। যদিও এইটা একদমই আমার ব্যক্তিগত মতামত। বাঙালিরা যে প্রতিভার আড়ালের প্রকৃত প্রতিভাবান মানুষটিকে মূল্যয়ন করতে পারে না তার উদাহরণ আরমান আলিফ ও টুম্পার বিষয়টি থেকে আবারও স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতরই হয়ে ওঠে যেন। আরমান আলিফের অবদানই যেখানে মুখ্য, সেইখানে টুম্পার অবদানই প্রধান হয়ে দেখা দিলো বাঙালিদের কাছে। আফসোস করে বলতে হয় কবিগুরুর ভাষায়-

‘বহু দিন ধ’রে বহু ক্রোশ দূরে
বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে
দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা,
দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু।
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশিরবিন্দু।’

কিংবা-

‘শীর্ণ শান্ত সাধু তব পুত্রদের ধরে
দাও সবে গৃহছাড়া লক্ষ্মীছাড়া ক’রে।
সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী,
রেখেছ বাঙালী করে, মানুষ কর নি।’

বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে আমরা বাংলাদেশের অন্যতম বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলামের বিষয়টিও আনতে পারি। যিনি জেএন ইসলাম নামে সমধিক পরিচিত এবং বিজ্ঞানীদের কাছে বাংলাদেশ জেএন ইসলামের দেশ হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিলো। জানা যায়, বিশ্বিবিখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংয়ের রুমমেট, বন্ধু এবং সহকর্মী ছিলো এই জেএন ইসলাম। বাংলাদেশের এই প্রতিভাবান বিজ্ঞানীর জন্ম ১৯৩৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ঝিনাইদহে। সেই সময়ের বিখ্যাত বিজ্ঞানী ব্রায়ান জোসেফসন, রিচার্ড ফাইনমেন, অর্মত্য সেন, প্রফেসর আব্দুস সালাম, ফ্রেডরিক হয়েল প্রমুখ বিজ্ঞানী ছিলেন জেএন ইসলামের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। স্টিফেন হকিংয়ের বিশ্বখ্যাত বই ‘অ্যা ব্রিফ হিস্টরি অফ টাইম’- এর আগেও লেখা হয় জেএন ইসলামের দদি আল্টিমেট ফেইট অফ দি ইউনিভার্স’ বইটি, যা প্রকৃত বিবেচনায় স্টিফেন হকিংয়ের বিশ্বখ্যাত বইটির তুলনায় কোনো অংশেই তুচ্ছ নয়। কিন্তু আমরা বাঙালি কতোটুকু চিনি আমাদের দেশের গর্ব ও অহংকার বিশ্ববিখ্যাত এই বিজ্ঞানীকে! তার নামই বা জানি কয়জন! কিন্তু বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংয়ের নাম শুনিনি এমন শিক্ষিত বাঙালি খুব কমই আছে। আমরাই আমাদের দেশের মিডিয়া ও পত্র-পত্রিকায় স্টিফেন হকিংয়ের গুণগান গেয়ে তাকে নিয়ে মাতামাতি করেছি সবচেয়ে বেশি। আর জেএন ইসলামের ক্ষেত্রে এদেশের মিডিয়া ও পত্র-পত্রিকাগুলো ছিলো অতি কৃপণ; তার পাশে দাঁড়িয়েছিলো যেন শুধু দায়সারাভাবে! যে দেশে প্রতিভা থাকতেও এভাবে প্রতিভার অবমূল্যায়ন করা হয়, সেই দেশ এগিয়ে যাবে কীভাবে! আমাদের আগে আমাদেরকেই চিনতে হবে- তবেই তো আমরা বিশ্বকে চিনতে পারব, বিশ্বও আমাদের চিনবে, তাই নয় কি?

আবার আমাদের দেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিষয়টিও বেশ দ্বিধাপূর্ণ। আমরা জানি, বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত কবি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, বামপন্থী বিপ্লবী কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মও কিন্তু বাংলাদেশে না। তারা জন্মেছিলেন ভারতে। ভারতের চুরুলিয়াতে জন্মেছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। কিন্তু তিনিই আজ বাংলাদেশের জাতীয় কবি! কবি সুকান্তকে নিয়ে এতো তোলপাড়, কিন্তু শুধুমাত্র তার পৈতৃক নিবাস ছিলো বাংলাদেশ। তাহলে কাদের নিয়ে আমরা এতো ঢাক-ঢোল পিটাচ্ছি! আমাদের দেশে ছিলেন মহাকবি মধুসূদন, মহাকবি কায়কোবাদ, পল্লীকবি জসীমউদদীন, মধ্যযুগের বিখ্যাত বাঙালি কবি আবদুল হাকিম, মুসলিম রেঁনেসার কবি ফররুখ আহমদ, গোলাম মোস্তফা প্রমুখ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলেও সত্য আমরা এদেরকে বাদ দিয়ে আমাদের মিডিয়া, পুস্তক ও পত্রিকাগুলোতে বেশি ঢাক-ঢোল পিটিয়েছি নজরুল, সুকান্তেরই। কিংবা এখনও প্রথিতযশা কোনো কবি-সাহিত্যিকের সন্ধানও পেতে পারতো এদেশ। তবে সুযোগ ও প্রতিভা বিকাশের উপযুক্ত মাধ্যমের কৃপণতায় অনেক প্রতিভায় তমসাচ্ছাদিত তমসায় বিলীন হয়ে যায়, ঝরে যায় ভোরের বৃক্ষপত্রের ন্যয়! হায়রে, বাঙালি! নিজের দেশের প্রতিভাকে চিনলি না আজও! পর ধন লোভেই মত্ত থাকলি আজীবন!

এখানে নিচের দুইটি উদাহরণ নিয়ে আসার প্রধান কারণই ছিলো, আরমান আলিফ ও টুম্পার জনপ্রিয়তার বিষয়টিকে আরও বেশি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা। আরমান আলিফও যেন বাঙালিদের কাছে এভাবেই টুম্পার জনপ্রিয়তার আড়ালে হারিয়ে গেছে! কিন্তু এই জনপ্রিয়তার সবটুকুই জুটবার কথা ছিলো আরমান আলিফের ভাগ্যেই। কিন্তু তা আর হলো না। টুম্পার মেয়েলি সৌন্দর্যেই যেন মানুষের কাছ থেকে হারিয়ে গেলো আরমান আলিফের নাম! সত্যিই বাঙালি যথাযথ প্রতিভার মূল্যায়ন করতে জানে না, তাইতো প্রতিভাগত দিক থেকে এদেশ আজও এগিয়ে চলেছে মন্থর গতিতে; আজও অন্যান্য ক্ষেত্রে জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সংস্কৃতির সাথে তাল মিলাতে ব্যর্থ প্রিয় লাল সবুজের এই ভূখণ্ড!

লেখক : ফয়সাল হাবিব সানি
তরুণ কবি ও সাংবাদিক, বাংলাদেশ। 
‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০১৮’- তে প্রকাশিত চারটি কবিতাগ্রন্থের রচয়িতা।
স্নাতক (সম্মান) তৃতীয় বর্ষ (বাংলা বিভাগ), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বশেমুরবিপ্রবি), গোপালগঞ্জ।
ই-মেইল : habibsany728@gmail.com
ফেইসবুক সার্চ : Foysal Habib Sany
গুগল সার্চ : ফয়সাল হাবিব সানি
ইউটিউব সার্চ : ফয়সাল হাবিব সানি