Opu Hasnat

আজ ১৬ ডিসেম্বর রবিবার ২০১৮,

ফিফা বিশ্ব কাপ- উত্তাপ, উচ্ছ্বাস না কি অন্য কিছু ? : আবুল খায়ের মতামত

ফিফা বিশ্ব কাপ- উত্তাপ, উচ্ছ্বাস না কি অন্য কিছু ? : আবুল খায়ের

বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হলো ফুটবল। ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে প্রথম বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতার আসর হওয়ার পর থেকে শুরু করে কালের বিবর্তনে এ খেলায় এসেছে অনেক পরির্বতন। জনপ্রিয়তাও বেড়েছে অনেকগুণ বেশী। ২০১৮ সালে দাঁড়িয়ে ফিফা বিশ্বকাপ বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও উত্তেজনায় ভরপুর একটি খেলা। যার দর্শক ২৩০ টি দেশের মধ্যে এমন কোন দেশ পাওয়া যাবে না, যেখানে ফিফা ফুটবল খেলা উপভোগ করা হচ্ছে না। সারা বিশ্বব্যাপী চলছে বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনা। শিশু থেকে শুরু করে বয়ো-বৃদ্ধ পর্যন্ত খেলা দেখা, উপভোগ করা ও সাথে সাথে আবেগ বা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা নিয়মিত ব্যাপার। আর এ থেকে দূরে থাকা মানে পিছিয়ে পড়ার মতো অবস্থা। যেন কোন গুরুত্বপূর্ণ কিছুকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া। তবে ভয়াবহ ও চিন্তার বিষয় হলো-বর্তমান অবস্থায় খেলা দেখে আবেগ বা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করার মধ্যে আর সীমাবদ্ধ নেই। রীতিমতো মারামারী বা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার নানা রকম ফন্ধি ফিকির করতে দেখা যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে অভিজাত এলাকার রেস্টুরেন্টে বসে প্রিয় দলের পক্ষে বা প্রিয় খেলোয়াড়ের পক্ষে সাফাই গাওয়া অব্যাহত থাকছে স্বার্থহীনভাবে। বিতর্কের ঝড় এখন তুঙ্গে। তর্ক-বিতর্ক করা ছাড়াও মারামারিতে জড়িয়ে পড়তেও দেখা যাচ্ছে কোথাও কোথাও। 

ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থক সবচেয়ে বেশী এদেশে। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার খেলাকে কেন্দ্র করে নোয়াখালীর সেনবাগে ডুমুরিয়া গ্রামে সমর্থকদের মধ্যে বিতর্কে জড়িয়ে মারামারিতে কয়েকজনকে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবরও পত্রিকায় দেখা গেছে। একইভাবে দু’দল প্রতিপক্ষ সমর্থকদের মধ্যে লক্ষীপুরেও ঘটেছে মারামারির ঘটনা। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু ছোট-খাটো অপ্রীতিকর ঘটনার সূত্রপাত হতে দেখা যাচ্ছে। যা আশংকাজনক ও চিন্তার বিষয় বটে।

ক্রিকেট খেলায় বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে ঠিকই। কিন্তু ফুটবল খেলায় এখনো অনেক পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যদিও অতি সম্প্রতি নারী ফুলবলে কিছুটা হলেও আলোর মুখ দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের নারী ফুটবল দলের সদস্যগণ আমাদের মুখ কিছুটা হলেও উজ্জল করতে সচেষ্ট হয়েছে এবং কৃত্বিতের দাবীও রাখছে বিশ্ব ইতিহাসে। বলা বাহুল্য যে, জনপ্রিয় এ খেলার প্রতি বাঙালীদের আগ্রহ, উৎসাহ ও উদ্বিপনা অন্য যেকোন খেলার চেয়ে অনেক বেশী। দিন দিন তা বেড়েই চলছে। আর সেটা বহুবছর আগে থেকেই হয়ে আসছে। বড় বড় পতাকা বানিয়ে রাস্তায়, হাটে, ঘাটে, বাজারে টাঙিয়ে দেয়া এমনকি বাড়ির ছাদে পতপত করে উড়তে দেখা যাচ্ছে প্রিয় দল বা সমর্থিত দেশের পতাকা। নিজের পছন্দের দলের পক্ষে সমর্থকদের কেউ তিন কিলোমিটার আবার কেউ পাঁচ কিলোমিটার লম্বা পতাকা বানিয়ে জানান দেয়ার চেষ্টা করছে যে, তারা তাদের প্রিয় দলকে কতোটা ভালোবাসে। কেউ পুরো বহুতলা বাড়িকে দলের পতাকার রঙে রাঙিয়ে একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে নিজেকে জাহির করার সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। আবার কেউ শত শত পতাকা দিয়ে পুরো এলাকাকে পছন্দের দল বা দেশের পতাকায় সাজিয়ে তুলছে। খেলায় জিতলে খিচুরী, পোলাও/বিরানী বা খানাপিনার ব্যবস্থা ছাড়াও অনেকে রীতিমতো মেজবানী খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করতে দেখা যাচ্ছে। নবীনদের মধ্যে এছাড়াও আছে নানামুখী আয়োজন। যা বলার অপেক্ষা রাখেনা।   

কোন কোন বাড়িতে একাধিক দলের পতাকা শোভা পাচ্ছে। কারণ পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন দলের সমর্থক। কেউ জার্মানি, কেউ ফ্রাঞ্চ, পর্তুগাল বা আর্জেন্টিনা/ব্রাজিল। এমন কোন বাড়ি নেই, যে বাড়িতে কোন না কোন দলের বা দেশের পতাকা টাঙানো হয়নি। কার পতাকার সাইজ কতো বড়, এ নিয়ে খোশগল্প করতে দেখা যায় সমর্থকদের মধ্যে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম টুইটার, ফেইসবুকে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড় বা দলের নানা রকম ব্যঙ্গ চিত্র বা ছবি প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে। নিজের প্রিয় দল খেলায় হেরে গেলেও চলে নানা রকম কসরত প্রদর্শন। গালি গালাজ ও অশোভনীয় আচরণ করতেও দেখা যাচ্ছে কাউকে কাউকে। যেটা কোনক্রমেই উচিত নয়। খেলা নিয়ে যেকোন ধরনে অসদাচরণ পরিহার করা সকলের কাম্য।

রোনান্ডো, নেইমার বা মেসির ভক্ত বেশী বাংলাদেশে। খেলার সময় এই খেলোয়াড়দের কোন রকম ভুল হতে দেখলেই চলে তুমুল বির্তক, উচ্ছ্বাস বা আবেগ তাড়িত হই হুল্লোড়। আবার খেলায় ভালো করা বা গোল করা দেখলেও সমর্থকদের মধ্যে চলে একই ভাবে আনন্দ প্রকাশের আয়োজন। নানা রকম মন্তব্য বা স্ট্যাটাস দিয়ে জানান দেয়া হয় যে আমার প্রিয় খেলোয়াড়ই কেবল এমনটি করতে পেরেছে। আর এই সব টাইমলাইনে বা স্ট্যাটাসে মন্তব্য করতেও হুমরি খেয়ে পড়ে সমর্থকরা। কার স্ট্যাটাসে কতোগুলো লাইক বা মন্তব্য পড়েছে তা নিয়েও চলে আলোচনা ও সমালোচনা। সমর্থকদের মধ্যে প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন দুর্ঘটনা ঘটার খবরও থাকে। হাতাহাতি, মারামারি, আক্রমন পাল্টা আক্রমন এই রকম ছোটো খাটো অনেক ঘটনা কিন্তু থাকছেই নিয়মিত। তবে ঢাকাতে এক আর্জেন্টিনা ভক্তের সুইসাইড করার ঘটনাও ঘটেছে বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা গেছে। এরকম ঘটনা বিশে^র আর কোথাও দেখা গেছে কিনা সেই রকম কোনো তথ্য জানা যায়নি। কিন্তু বাংলাদেশে ঘটছে এটা হলো বড় কথা। সম্প্রতি ব্রাজিলের তিনজন সাংবাদিক বাংলাদেশ সফর করে এ মন্তব্য করেছেন যে, বাংলাদেশের মতো এতো ব্রাজিলের সমর্থক পৃথিবীর আর কোথাও তারা দেখেননি। তাঁদের ভাষায় এটা একটা বিরল ঘটনা। কারণ এতো দূরের একটা দেশ ব্রাজিল, যে দেশটি সম্পর্কে ভালোভাবে অনেকেই কিছু জানে না। জানার সুযোগও নেই। কিন্তু ফুটবলারদের নাম অনেকেরই মুখস্থ এবং ফুটবল দলের প্রতি অন্ধ সমর্থন এতো বেশী, যা কল্পনাতীত ও বটে।

এখন প্রশ্ন হতে পারে। খেলা নিয়ে কেন এতো উৎসাহ বা উচ্ছ্বাস? কেউ কেউ বলেন-দেশে বেকার ও হতাশাগ্রস্তদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণেই খেলা দেখার জন্য যথেষ্ট সময় পাচ্ছে এবং সমর্থকদের অহেতুক ঘটনা প্রবাহ জন্মদিতে সহায়ক পরিবেশ পাচ্ছে। বিনোদন প্রিয় বাঙালির বিকল্প কোন বিনোদনের ব্যবস্থা না থাকায়, ফুটবল খেলা দেখা ও উপভোগ করাকে বিনোদন হিসেবে গ্রহণ করাও উচ্ছ্বাস প্রকাশের কারণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। 

তবে চিন্তার বিষয় এই যে, ভীনদেশী পতাকার সাইজ বিরাট আকার, তার পাশেই ছোট একটা বাংলাদেশের পতাকা উড়ানো কেমন যেন একটা বেমানন। এমনটি নিজ দেশের পতাকার প্রতি অপমানজনক কিনা তা ভেবে দেখার সুযোগ আছে। আবার কেউ কেউ একই বাঁশের খুটিতে একেবারে বাঁশের মাথায় ছোট একটা বাংলাদেশের পতাকা এবং তারই একটু নীচে বিরাট সাইজের একটা ভীনদেশীয় (প্রিয় দলের/দেশের) পতাকা উড়ানো কেমন যেন একটা দৃষ্টিকটু এবং আপত্তিকরও বটে। এধরনের উচ্ছ্বাস সমর্থনযোগ্য কিনা বা  উচিত কিনা তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। দিন দিন সেটা যেন সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশী না হয়ে যায়, সেদিকেও সচেতন নাগরিকদের খেয়াল রাখতে হবে। অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস যেন ক্ষতিকর কোন কিছুকে উসকিয়ে দিতে না পারে এবং নিজের সংস্কৃতির ওপর কোনরূপ নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে সংশ্লিষ্টদের। আগে দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশ, পরে অন্যসব। ফুটবল খেলায় বাংলাদেশের উৎকর্ষতা বৃদ্ধি পাবে। বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশের ফুলবল একসময় বিশ্বকাপ বিজয়ে সামর্থ্য অর্জন করবে, সেই প্রত্যাশায়। 
(লেখক: কবি, কলামিস্ট ও ঊন্নয়ন কর্মী)