Opu Hasnat

আজ ২৩ সেপ্টেম্বর রবিবার ২০১৮,

চাদঁপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি গঠন নিয়ে তোলপাড় ফরিদপুর

চাদঁপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি গঠন নিয়ে তোলপাড়

ফরিদপুরের সদর উপজেলার ধোপাডাঙ্গা চাদঁপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি গঠন নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। আর এই কমিটি গঠনের অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন স্থানীয় চেয়ারম্যান ও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলে কথা উঠেছে। এরই মাঝে গত মঙ্গলবার ছিলো মনোনয়নপত্র জমাদানের শেষ দিন সেখানে মোট ৫টি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে। যেখানে ৫টি পদে নির্বাচন হবে সেখানে মনোনয়নপত্র জমাও পড়েছে ৫টি। বুধবার ছিলো বাছাইয়ের দিন সেখানে ফরিদপুর সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মাহবুবা খাতুন এই ৫টি মনোনয়নপত্রকে সঠিক বলে রায় দিয়েছেন। ধারনা করা হচ্ছে ৫টির বেশী মনোনয়নপত্র জমাদানের কোন সুযোগ তৈরি করেননি প্রভাবশালীরা। অনেক অভিবাবক নির্বাচনে আসতে চাইলেও তাদেরকে ভয়ভীতি দেখিয়ে নির্বাচন করতে দেয়া হয়নি বলে জানাগেছে। আর এ নির্বাচনের অনিয়ম তুলে ধরে অভিবাবকরা এরই মধ্যে ফরিদপুর জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন। 

বিদ্যালয়টিতে আগামী ২৬ জুলাই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিলো। আর এমন ঘটনার কারনে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে ছাত্রছাত্রী এবং অভিবাবকদের মধ্যে। 

সরোজমিনে গিয়ে জানাযায় ধোপাডাঙ্গা চাদঁপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি প্রতি বারই সকলের অংশগ্রহনে এবং ভোটাভুটির মাধ্যমে অভিভাবক নির্বাচিত হয়ে আসছে। এবার সেই নিয়মের ব্যতয়ের ঘটনা ঘটলো। বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচনের জন্য মনোনয়নপত্র একটি মহল ব্যক্তিগত পছন্দের তালিকা করে সংগ্রহ করেছে কিন্তু সকল অভিবাবকদের এই মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করার কোন সুযোগ দেয়া হয়নি বলে নাম না প্রকাশ করার শর্তে একাধীক অভিবাবক সাংবাদিকদের জানান।   

বিদ্যালয়ের সদ্য গত কমিটির সদস্য সরোয়ার হোসেন জানান, সরাসরি অভিবাবকদের ভোটে বিদ্যালয়টিতে পরপর চারবার নির্বাচিত সভাপতি হয়েছেন সিআইপি ড. যশোধা জীবন দেবনাথ। তিনি স্কুলের অবকাঠামোগত উন্নয়নে, পড়ালেখার মান উন্নয়নে বড় ভূমিকা রেখেছে। অভিভাবকদের কাছে সব সময় তার গ্রহনযোগ্যতা রয়েছে আকাশচুম্বি। গত বছর বিদ্যালয়ের টাকা পয়সার দূর্নীতির ব্যাপারে জরিয়ে পড়েন স্কুলের প্রধান শিক্ষক ইমরুল কবির জিহাদ। সে সময় বিদ্যালয়ের সভাপতি সিআইপি ড. যশোধা জীবন দেবনাথ তাকে সংযত হতে বলেন। আর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার সাথে সম্পর্ককের অবনতি ঘেেট প্রধান শিক্ষকের। সেই থেকে প্রধান শিক্ষক বর্তমান সভাপতি সিআইপি ড. যশোধা জীবন দেবনাথকে বিদ্যালয় থেকে বিতারিত করতে উঠে পড়ে লাগেন।  

তিনি বলেন এ পর্যন্ত যত সভাপতি ছিলো তার মধ্যে আমরা শ্রেষ্ট সভাপতি হিসেবে পেয়েছিলাম সি আই পি ব্যাক্তিত্ব ড. যশোদা জীবন দেবনাথকে। তিনি সভাপতি থাকাকালিন সময়ে ছাত্রছাত্রীদের জন্য ৫টি টয়লেট নির্মান করেছেন। প্রতিটি ক্লাসে নতুন হোয়াইট বোর্ড স্থাপন করেছেন। স্কুলের শিক্ষকদের বেতন স্বল্পতা থাকায় ব্যাক্তিগত তহবিল থেকে ১লাখ ২০ হাজার টাকা নগদ অনুদান দিয়েছেন। নিজ ব্যয়ে স্কুলের দোতালা ভবন নির্মান করেছেন। প্রতিবছর জিপিএ ৫ পাওয়া ছাত্রছাত্রীদের মাঝে নিচ খরচে ল্যাপটপ বিতরন করেছেন। এসব সেবামুলক কাজের জন্য সব অভিভাবকদের কাছে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়। সত্যিকার অর্থে যদি নির্বাচনের পরিবেশ থাকতো তাহলে তিনিই সভাপতি নির্বাচিত হতেন। তিনি আরো বলেন, বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন করার ইচ্ছা অনেক অভিভাবকদের ছিলো কিন্তু কেউ এমন পরিবেশে সাহস পায়নি। 

ম্যানেজিং কমিটির আরেক সদস্য ত ম মাসুদ পারভেজ বলেন, বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি নির্বাচিত হতো অভিভাবকদের সরাসরি ভোটের মাধ্যমে কিন্তু এবার ব্যতিক্রম হলো। তবে আগের কমিটি ছিলো অভিভাবকদের পছন্দের কিন্তু বর্তমান কমিটি যতটুকু জেনেছি চাদঁপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শামছুননাহার মহির পকেট কমিটি। তিনি অযোগ্য ব্যক্তিদের দিয়ে একটি ভোটবিহীন একটি কমিটি করেছে। এ্ই কমিটির উপর সাধারন অভিভাবকদের কোন আস্থা নেই। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইমরুল কবির জিহাদ চাদঁপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শামছুননাহার মহির নিকট আত্মীয়। সেই সুবাদে স্কুলের সব রকমের দূর্নীতির বিষয়ে সহযোগীতা পায় প্রধান শিক্ষক। 

তিনি আরো বলেন, বিদ্যালয়ের ৬ষ্ট শ্রেনী থেকে ১০ম শ্রেনী পর্যন্ত মাসিক বেতন সম্পূর্ন ফ্রি করে দিয়েছিলেন বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ড. যশোধা জীবন দেবনাথ। এই বিষয়ে আপত্তি জানায় চাদঁপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শামছুননাহার মহি। ফলে অর্থ বছরে এই বেতন ফ্রি বাতিল করে দেন প্রধান শিক্ষক। অথচ গরীব ও মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের এই বেতন পরিশোধ করতেন যশোধা জীবন দেবনাথ। স্কুলের উন্নয়নে এমন দানশীল, শিক্ষিত এবং যোগ্য সভাপতি দরকার। কিন্তু ব্যক্তি পছন্দের অযোগ্য লোকই নির্ধারন করলেন চেয়ারম্যান। 

বিদ্যালয়ের কেরানী দিলিপ রুদ্র বলেন, শুনেছি ৫টি পদে ৫টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। নির্বাচন হচ্ছে না। একটি সমঝোতা হওয়ার কথা ছিলো সেটাও আর হয়নি। 

পাশের কানাইপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বেলায়েত ফকির বলেন, সাধারন মানুষ চায় যশোদা জীবন দেবনাথ সভাপতি হোক তাহলে ধোপাডাঙ্গা চাদঁপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান এবং উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকবে। কারন এটা প্রতিনিয়ত প্রমানিত যে যশোদাজীবন দেবনাথ গরীব ছাত্রছাত্রীদের জন্য সহায়ক ভূমিকা রাখছে। তিনি বলেন আমার উপর দায়িত্বও দেয়া হয়েছিলো সুন্দর একটি পরিবেশ তৈরি করার কিন্তু সেটা সম্ভব হলো না।   

হাবিব নামে এক অভিবাবক জানান, ড. যশোদা জীবন দেবনাথ শুধুই স্কুলের উন্নয়নেই বড় ভূমিকা রাখেন নাই। তিনি চাদঁপুর ইউনিয়ন এর নতুন ভবন নির্মানের জন্য জায়গা ক্রয় করে ইউনিয়নকে দান করেন। এবং সেখানে বর্তমানে যে ভবন নির্মান হয়েছে সেখানে নগদ অর্থও প্রদান করেছেন। এমন একজন দাতা ব্যক্তিকে খুবই দরকার ছিলো বিদ্যালয়টিতে। 

এদিকে স্কুলের প্রধান শিক্ষক ইমরুল কবির জিহাদ তার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন আরো তিনটি মনোনয়নপত্র জমাদানের কথা ছিলো কিন্তু কি কারনে হলো না আমি তা বলতে পারবো না। তবে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মাহবুবা খাতুন ৫টি মনোনয়নপত্র বৈধ বলে রায় দিয়ে গেছেন। বৃহস্পতিবার মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন রাখা রয়েছে। 

চাদঁপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শামছুননাহার মহির মোবাইলে ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি এ ব্যাপারে তার সাথে সরাসরি গিয়ে কথা বলতে বলেন। পরে স্কুলের ঘটনায় তিনি জরিত কিনা এমন প্রশ্নের ব্যাপারে তিনি বলেন স্কুলের বিষয় স্কুল বুঝবে আমি এসব ব্যাপারে জরিত হওয়ার প্রশ্নই আসে না। আপনারা যা লিখছেন সেটা ফেসবুকে আমি দেখেছি, আপনি ফেসবুকে গিয়ে দেখেন।   

এ ব্যাপারে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক বেগম উম্মে সালমা তানজিয়া জানান, আমার কাছে ওই বিদ্যালয়ের নির্বাচনের অনিয়ম তুলে ধরে অভিযোগপত্র জমা পড়েছে। আমি এ ব্যাপারটি নজরে আসার সাথে সাথে সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মাহবুবা খাতুনকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহনের কথা বলে দিয়েছি।       

এদিকে এ ঘটনায় অভিভাবক এবং ছাত্রছাত্রীরা প্রশাসনের কাছে এ ধরনের গোপন কমিটি বাতিল চেয়ে সবার অংশ গ্রহনে একটি সুষ্ঠ সুন্দর নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করার দাবি জানিয়েছেন।    

উল্লেখ্য চাদঁপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গত ২৬ জুন ফরিদপুর জেলা প্রশাসন সম্মেলন কক্ষে গ্রাম আদালত বিষয়ে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন সেখানে তিনি তার বক্তব্য সাংবাদিকদের বিষয়ে আপত্তিকর বক্তব্য  রাখেন। যা সাংবাদিক সমাজকে চরমভাবে হেয় করে তার বক্তব্য। সে সময় অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এরাদুল হক সকল সাংবাদিকের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন এ ধরনের ঘটনায়।