Opu Hasnat

আজ ২৩ জুলাই সোমবার ২০১৮,

সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে টাকা ছাড়া ঔষধ মিলে না

অনিয়ম-র্দূনীতির কারণে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত স্বাস্থ্যসেবাসুনামগঞ্জ

অনিয়ম-র্দূনীতির কারণে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত

১১টি উপজেলা ও ১টি থানা নিয়ে হাওরের জেলা সুনামগঞ্জের অবস্থান। এই জেলার মোট জনসংখ্যা হচ্ছে প্রায় ২৫ লাখের উপরে। র্দূগম যোগাযোগ বিছিন্ন এই জেলার বিশাল জনগোষ্ঠির স্বাস্থ্যসেবার জন্য একমাত্র সরকারী হাসপাতাল হচ্ছে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালটি। বহু দূরদরান্ত থেকে প্রতিনিয়ত রোগীরা আসছেন জেলার ২৫০ শয্যা সরকারী হাসপাতালে । কিন্তু এখানে চিকিৎসার নামে চলছে রোগীদের সাথে প্রতিনিয়ত প্রতারণা। কিন্তু সেখানে প্রতি নিয়ত ভোগান্তির স্বীকার হচ্ছেন দুর দুরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা  বিভিন্ন গ্রামের সহজ সরল রোগী ও তাদের স্বজনরা। 

যেখানে দরিদ্র ও অসহায় রোগীরা সরকারীভাবে চিকিৎসাসেবা ও ফ্রিভাবে ঔষধ পাওয়ার কথা  সেখানে হাসপাতালের একটি সিন্ডিকেট চক্রের শরনাপন্ন হয়ে সর্বস্ব খোয়াচ্ছে রোগী ও তাদের স্বজনরা। অন্যদিকে ঐ চক্রটি অধিক মোনাফা লাভের আশায় দীর্ঘদিন ধরে সরকারী ঔষধগুলো যেখানে রোগীদের কাজে ফ্রিভাবে ব্যবহার করার কথা তা না করে তারা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার সরকারী ঔষধগুলো  কালোবাজারের মাধ্যমে চলে যাচ্ছে বিভিন্ন ফার্মেসীগুলোতে।   ফ্রি ঔষধ না পেয়ে রোগীরা বাধ্য হয়ে বাহির থেকে মোটা অংকের টাকা দিয়ে খরিদ করে আনতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে সরকারী চিকিৎসা সেবা নিয়ে হাসপাতাল ও ফার্ম্মেসী দিয়ে চলছে লুটপাটের ব্যবসা। ফলে হাসপাতালে কর্তব্যরত কিছু তৃতীয় ও চতুর্থশ্রেণীর দূর্নীতিবাজ সদস্য ও বাহিরের কিছু লোকজন  মিলে একটি সিন্ডিকেট করে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়ে অল্পদিনে একাধিক বাড়ি গাড়ি সহ কোটি কোিট টাকার অবৈধ সম্পদ বানিয়ে আঙ্গুল পুলে গলাগাছ বনেছেন। হাসপাতালের এমন অনিয়ন র্দূনীতি নিত্যদিনে পরিণত হলেও কর্তপক্ষের  উদাসীনতা সেবা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের রীতিমতো ভাবিয়ে তুলেছে। 

ওয়ার্ড থেকে শুরু করে হাসপাতালের প্রতিটি কক্ষে সিট বাণিজ্য আর অনিয়ম র্দূনীতি যেন হাসপাতালে নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। 

সরেজমিনে হাসপাতালে  ঘুরে প্রতিষ্ঠানে চুক্তিভিত্তিক ওয়ার্ড কিপার, কেরানী রোগী ও স্বজনদের সাথে কথা বলে এবং অনুসন্ধানে জানা যায় ঐ চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার করে হাসপাতালে আসা রোগীদের কাছ থেকে সেবার নামে প্রতিনিয়ত হাতিয়ে নিচ্ছেন হাজার হাজার টাকা । অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে আরো নানান অনিয়ম আর র্দূনীতির লম্বা ইতিহাস।
 
প্রতিদিন হাসপাতালে আসা শত শত রোগীদের আহাজারি ও ভোক্তভোগীদের নালিশ শুনতে শুনতে কান ভারি হয়ে  উঠেছে। কথায় আছে না বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাদেঁ  এমনটা হয়ে দাড়িয়েছে ঐ হাসপাাতলে। 

জানাযায়, জেলার একমাত্র চিকিৎসাসেবার ভরসাস্থল সদর হাসপাতালে অনিয়ম আর র্দূনীতি যেন নিয়মে পরিণত হয়ে গেছে। এই হাসপাতাল রোগীদের ভোগান্তি আর র্দূভোগ যেন ঐ প্রভাবশালীদের দিয়ে ব্যবসায় পরিনত হয়ে গেছে । জেলার ২৫ লাখ মানুষের উন্নত চিকিৎসা সেবা দেয়ার জন্য সরকার ঐ হাসপাতালে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা ঔষধ ও চিকিৎসাসেবার কাজে বরাদ্দ দিয়ে থাকে । কিন্তু এসব বরাদ্দকৃত টাকার সিংহভাগ ও অধিকাংশ ঔষধ রোগীদের স্বপ্লমূল্যে নামসর্বস্ব প্যারাসেটামল,নাপা,এন্ট্রাসিড ফ্রিভাবে দেয়া হলেও দামি ঔষধগুলো সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কালোবাজারে চড়াদামে বিক্রি করে দেয়ার ও অভিযোগ রয়েছে। আর বরাদ্দকৃত অর্থের টাকার মধ্যে লোক দেখানো কিছু কাজ দেখানো হলেও সিংহভাগ টাকা সঠিকভাবে ব্যয় না করে ভাড়ভাটোয়ারা করে নেয়া হচ্ছে বলে ও অভিযোগ একাধিক ব্যক্তির।  সদর হাসপাতালের ফার্মেসী ঔষধ বিতরণ কেন্দ্রের দেয়ালে চার্ট টাঙিয়ে কি কি ঔষধ রোগীদের দেওয়া হয় তারজন্য  জনসম্মুখে একটি সাইনবোর্ড টানিয়ে তুলে ধরেছেন কর্তৃপক্ষরা।
 
কিন্তু বাস্তবে রোগীদের কি কি ঔষধ দেয়া হচ্ছে তা কি কর্তপক্ষরা কোনদিন মনিটরিং করেছেন তারা কি জেনেও না জানার বান করছেন এমনটাই ভোক্তভোগীরা মনে করেন।  হাসপাতালে ঔষধ সামগ্রী এবং হাসপাতালের উন্নয়নে প্রতিবছর সরকার কতকোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে থাকেন এবং এই টাকাগুলো সঠিক কাজে ব্যয় করা হচ্ছে কিনা না তার তালিকা চেয়েও কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে পাওয়া যায়নি।  

হাসপাতালে প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বহিঃবিভাগে আসা রোগীদের চিকিৎসার জন্য শুধু ঔষধ বিতরন কেন্দ্রে  রাখা হয়েছে  ৩১ ধরনের ঔষধ। যার মধ্যে ক্রো-ট্রাইমোক্সজোন, প্যারাসিটামল, মেট্রোনিডাজল, সালবুটামল, এ্যামক্সসিলিন সহ ৭ধরনের সিরাপ রয়েছে । এছাড়া ট্যাবলেট রয়েছে প্যারাসিটামল(৫০০)এমজি, এন্টাসিড, মেট্রোনিডাজল, কট্রিম, হিস্টাসিন, পেনিসিলিন, সিক্সোফক্সাসিন (৫০০)এমজি, নিভোফক্সাসিন, ফেরাস সালফেড, বি-কমপ্লেক্স, মেবেনডাজল, এলবেনডাজল(৪০০)এমজি, সালবুটামল, হাইসুমাইড, ভাইক্লোফেন(৫০)এমজি, পেডনিসলন, পেনট্রোফ্লাজল(৪০/২০)এমজি, বি বি লোজন, বেনজিক এসিডওয়েল মেট, ক্যাপসুল টেট্রাসাইক্লিন(২৫০)এমজি, এ্যামক্সসিলিন(২৫০)এমজি, সেফরাডিন(৫০০) এমজি, ওমিপ্রাজল(২০) এমজি ছাড়াও ষ্টকে রয়েছে আর উন্নত ঔষধ যা প্রত্যকটি ওয়ার্ডে বিতরণ করার কথা রয়েছে। কিন্তু ঐ সমস্ত ঔষধ থাকার পরও রোগীদের সেবায় তা ব্যবহার না করে চক্রটি বাহিরে কালোবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছেন। ফলে রোগীরা হাসপাতালের বাহিরে বিভিন্ন ফার্ম্মেসী হতে চড়াদমে ঔষধ কিনে আনতে হয়। 

হাসপাতালে সেবা নিতে আসা গৌরারং ইউনিয়নের নুরুল ইসলাম জানান, আমি গরীব মানুষ হিসেবে এই সরকারী হাসপাতালে এসেছিলাম বিনা টাকায় আমার বাচ্ছার চিকিৎসা সেবা দিতে। কিন্তু এসে দেখলাম কর্তব্যরত ডাক্তার আমাকে ৬০০ টাকার ঔষধ লেখে দিয়েছেন আর একটা নাপা সিরাপ হাসপাতাল থেকে দিয়েছেন। 

মাইজ বাড়ী এলাকা থেকে আসা নজিম মিয়া জানান আমরা হাসপাতালে সরকারী ঔষধ পাবার আসায় আইছি কিন্তু একপাতা প্যারাসিটামল আর নাপা ছাড়া  কিছুই দেয়না । ডাক্তাররা বাহির থেকে ঔষধ কিনে আনতে বলে। এই যে অনিয়ম আর র্দূনীতি অইতাছে সরকার কি এইগুলা দেখেনা। ভাতেরট্যাক থেকে আসা মোহাম্মদ আশাদ আলী বলেন আমি আমার মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে আইছি ডাক্তার একপাতা হিস্টাসিন আর প্যারাসিটামল দিয়েছে এবং বাকি ঔষধগুলো বাহির থেকে ৭০০ টাকায় কিনে এনেছি কিনছি। পৌর শহরের হাছন নগর এলাকা থেকে আসা পারভীন বেগম জানান আপনারে আর কি কইতাম হাসপাতালে আইয়া প্যারাসিটামল আর নাপা এন্ট্রসিট ছাড়া আর কিছুই পাওয়া জায়না ডাক্তারের কাছে আইলেই টাকা দিয়া ঔষধ কিনা লাগে । এইটা নামে হাসপাতাল কামে দুর্নীতির অফিস রাঘব বোয়ালরাই ঐ র্দূনীতি কইরা পেট ভরতাছে। 

তাহিরপুরের বাদাঘাট থেকে আসা ফুলেছা বেগম জানান আমি আমার ফুলারে লইয়া হাসপাতাল ভর্তি ছিলাম ৪/৫হাজার টাকার ঔষধ কিনা আনছি, হাসপাতালের কোন ঔষধ ফ্রি পাইছি না সেলাইন, ইনজেকশন  আর বড়ি কিনতে কিনতে দিশাহারা হইছি করজ কইরা টাকা আইন্না চিকিৎসা করাইছি আমার পুলারে আর টাকা নাই আসকে যাইতাছিগা । এছাড়াও শত অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে ভোক্তভোগী মানুষের। প্রায় সময় দেখা যায় রোগীরা ভীরকরে বসে থাকেন হাসপাতালের বারিন্দায় আবার অনেকে দরজার সামনে লাইন ধরে বসে থাকেন ডাক্তার আসার অপেক্ষায়। সেখানে একাধিক চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের কাছে গেলে দেখা যায় ডাক্তার আসেন নাই ডাক্তারের আসার অপেক্ষায় হতাশায় ভোগছেন সাধারণ রোগীরা। আবার দুই  একজন ডাক্তারকে নিয়মিত হাসপাতালে পাওয়া গেলেও অনেকেই তাদের ইচ্ছে মত রোগীর সেবা দিচ্ছেন এমন অভিযোগ ও রয়েছে অনেক ডাক্তারের উপর। তাছাড়াও রোগীদের বাহিরে দাড়ঁ করিয়ে ঔষধ কোম্পানির লোকেদেরকে নিয়ে ব্যাস্ত সময় কাটাচ্ছেন ডাক্তাররা এর দৃশ্য প্রতিদিন ই হাসপাতাল এলাকায় গেলেই দেখা যায়। 

দেখাযায়  ডাক্তাররা রোগীদের ঔষধ লিখে দিলেও হাসপাতালে ঔষধ বিতরণ কেন্দ্র যেখানে সকাল ৮টা থেকে দুপুর আড়াটা পর্যন্ত খোলা থাকার কথা সেখানে দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যেই  বন্ধ করে চলে যান ওখানের দায়িত্বে থাকা ফার্মাসিষ্ট ও ইনচার্জ। ফলে  অনেক রোগীকে ঔষধ বিতরণ কেন্দ্র বন্ধ দেখে ঔষধ ছাড়াই কালি হাতে বাড়ি ফিরতে দেখা যায় এমন দৃশ্য যেন প্রতিদিনের । সবচেয়ে মজার বিষয়টি হলো হাসপাাতলের কোয়াটারে থেকে সুবিদা ভোগ করে অনেকেই মাসের পর মাস হাসপাতালে ডিউটিতে অনুপস্থিত থাকলেও হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর ঠিকই দেয়া হয় এবং মাস শেষে বেতনভাতা তুলে নিচ্ছেনঐ চক্রের আত্মীয় স্বজনসহ অনেকেই। কিন্তু কেন কর্তৃপক্ষরা উদাসীন নাকি কর্তৃপক্ষ ঐ চক্রের কাছে জিম্মি বিষয়টি সাধারন মানুষজনকে ভাবিয়ে তুলেছে। হাসপাতালে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে ক্লিনার থেকে শুরু করে প্রত্যেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে । 

এ ব্যাপারে সদর হাপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) ডাঃ রফিকুল ইসলাম জানান, হাসপাতালের উন্নয়নে কি পরিমাণ টাকা বরাদ্দ আসে এবং কোন খাতে কত টাকা ব্যয় হয় তা জানা নেই। তবে সরকারী ঔষধ কালোবাজারে বিক্রি হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন সরকারী ঔষধগুলোতে  সরকারী মনোগ্রাম লাগানো থাকে কাজেই এগুলো বাহিরে বিক্রি করার কোন সুযোগ নেই। তবে হাসপাতালে গুটি কয়েক তৃতীয় ও চর্তুথ শ্রেণীর কর্মচারী ইতিমধ্যে শহরে একধিক বাড়ি গাড়ি ও কোটি টাকার মালিক কিভাবে বনেছেন আমার জানা নেই। 

এ ব্যাপারে সিভিল সার্জন ডাঃ আশুতোষ দাসের মোবাইল নম্বরে  একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও মোবাইল ফোনটি বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।