Opu Hasnat

আজ ২৩ অক্টোবর বুধবার ২০১৯,

ভাড়া দ্বিগুণ হলেও বাড়েনি যাত্রী সেবা, বৈষম্যের স্বীকার লালমনিরহাট রেল বিভাগ লালমনিরহাট

ভাড়া দ্বিগুণ হলেও বাড়েনি যাত্রী সেবা, বৈষম্যের স্বীকার লালমনিরহাট রেল বিভাগ

মিজানুর রহমান, লালমনিরহাট :  দীর্ঘ তিনযুগ পরে বর্তমান সরকারের সময়ে যোগাযোগ ব্যাবস্থা উন্নয়নে গনপরিবহন বাংলাদেশ রেলওয়ে কে ঢেলে সাজাতে নেওয়া হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প। লোকসান কমিয়ে রেলকে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে এসব প্রকল্প ভূমিকা রাখবে বলে রেল সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। অথচ সমুন্নত উন্নয়ন পরিকল্পনায় রেলের পূর্বাঞ্চল থেকে পশ্চিমাঞ্চল কে বরাবরের মত অবহেলার স্বীকার হতে হয়েছে। বৈষম্য রেখে উন্নয়ন হলে সেটার সুফল কখনই মধ্য আয়ের দেশ অর্জনে সহায়ক হবে না বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

বাংলাদেশের সমুন্নত উন্নয়ন এবং মধ্যম সারির উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে সরকার যে কর্মসূচী ঘোষনা করেছে, সেখানে পশ্চাদপদ জেলাগুলিকে সমুন্নত উন্নয়নে এগিয়ে না নিলে, ২০২১ সালকে ঘিরে সরকারের যে কর্মসূচী তা বাস্তবায়ন করতে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হবে।

স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশ রেলওয়ে দুটি অঞ্চলে বিভক্ত করে পরিচালিত হয়। ঢাকা, সিলেট, চট্রগ্রাম নিয়ে পুর্বাঞ্চল এবং লালমনিরহাট ও পাকশি নিয়ে পশ্চিমাঞ্চল রেল বিভাগ গঠিত। পশ্চিমাঞ্চলের পাকশি এবং লালমনিরহাট রেল বিভাগ উন্নয়নে স্বাধীনতার পরবর্তী সরকারগুলো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি, ফলে এই অঞ্চল বরাবরই উপেক্ষিত এবং অবহেলিত থেকেছে। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উত্তরাঞ্চলের পুত্রবধূ হিসেবে অবহেলিত উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নে বৈষম্য দূর করে এগিয়ে নিবেন তেমন প্রত্যাশা করেন এই অঞ্চলের মানুষ।

লালমনিরহাট রেল বিভাগের আওতায় বিভাগীয় শহড় রংপুর, উত্তরাঞ্চল জেলা গাইবান্ধা, বগুড়া জেলার সান্তাহার, কুড়িগ্রাম জেলার রমনা বাজার, লালমনিরহাট জেলার বুড়িমারী ও দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর ও বিড়ল স্টেশন প্রর্যন্ত বিশ্তৃত। যাতায়াতের বাহন হিসেবে উত্তরাঞ্চলের ৭০%মানুষ গনপরিবহন রেলের উপর নির্ভরশীল হলেও,এই অঞ্চলের মানুষের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়ন রেল বিভাগে হয়নি, ফলে মানুষের ক্ষোভ বিড়ম্বনা চাহিদার সাথে দিনে দিনে বেড়েছে।

দীর্ঘ দিন পরে হলেও বর্তমান সরকারের দুই মেয়াদে বাংলাদেশ রেল কে ঘিরে ৮৫হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।যার মধ্যে ২৯হাজার কোটি টাকা ব্যায় করে ইতিমধ্যে চল্লিশটি প্রকল্পের কাজ শেষ করা হয়েছে এবং আটটি প্রকল্প শেষ হবার পথে রয়েছে।এই প্রকল্পের মধ্যে ৮৫টি লোকমেটিভ ইঞ্জিন এবং ইন্দোনেশিয়া ও ভারত থেকে দুইমেয়াদে দুই শত কোচ আমদানি করা হয়েছে। পার্বতীপুর টু বিরল, লালমনিরহাট টু বুড়িমারি রেলপথ সংস্কার সিগনালিং ব্যাবস্থা উন্নয়ন, ঢাকা টু জয়দেবপুর ডুয়েলগেজ রেল নির্মান, পাবনা ঈশ্বরদী রেলপথ নির্মান, রাজবাড়ি টু ফরিদপুরের ভাঙা প্রর্যন্ত রেলপথ নির্মান, চারহাজার কোটি টাকা ব্যায়ে ঢাকা চট্রগ্রাম ডবল রেল লাইন নির্মান, ডেম্যূ ট্রেন ক্রয়, পুরাতন বিভিন্ন স্টেশন নতুন অবকাঠামো তৈরী সহ কক্স বাজার প্রর্যন্ত রেলপথ নির্মান করা হয়। এই প্রকল্প গুলো শেষ হলে বাংলাদেশ রেলওয়ে আমূল পরিবর্তন হবে রেল মন্ত্রী মুজিবুল হক সরকার দলীয় সাংসদ রহমতুল্লার প্রশ্নপত্রের উত্তরে জাতীয় সংসদে অবগত করেন।

লালমনিরহাট রেল বিভাগের আওতায় নতুন ভাবে আমদানিকৃত লাল সবুজের কোচ দিনাজপুর টু ঢাকা গামী তিশ্তা এক্সপ্রেস,দুরন্ত এক্সপ্রেস ও একতা এক্সপ্রেসে সংযোজন হলেও অদৃশ্য কারনে শতভাগ লাভজনক রংপুর বিভাগীয় শহড় থেকে ঢাকা গামী রংপুর এক্সপ্রেস ও ২০০৪ সাল থেকে যাত্রা শুরু লালমনিরহাট থেকে ঢাকাগামী লালমনি এক্সপ্রেস ট্রেনের ভাগ্যে জোটেনি।শুরু থেকেই আন্তঃনগর এক্সপ্রেস ট্রেন দুটি ত্রিশবছরের মেয়াদর্তীর্ন কোচ আর পুরাতন লোকমেটিভ ইঞ্জিন দিয়ে যাত্রা শুরু করে । চাহিদা থাকা স্বত্তেও নতুন কোচ আর লোকমেটিভ না পাওয়ায় বৈষম্যের স্বীকার হতে হয় এই অঞ্চলের যাত্রীদের।অথচ দুই মেয়াদে যাত্রীভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তঃনগর ট্রেনের ভাড়াগুনে লোকাল ট্রেনের সুবিধা নিতে হচ্ছে। এই বৈষম্য দীর্ঘদিন ধরে চললেও পশ্চিমাঞ্চলের জন্য বিমাতাসুলভ আচরন করা হয়েছে।

উদ্বোধনের শুরু থেকে লালমনি এক্সপ্রেস ও রংপুর এক্সপ্রেস ইরান থেকে আমদানিকৃত ১৯৮৬ সালের পুরনো কোচ দিয়ে চলছে। এদের বয়স ৩৫ বছর হওয়ায় বেশির ভাগ কোচের এয়ার ব্রেক ব্যাবহার অযোগ্য হয়েছে, ফলে ট্রেন দ্রুতগতিতে চালাতে গেলে লাইনচ্যূত্য হবার সম্ভবনা থাকে, বিধায় ট্রেনের চালক কে মধ্যমগতিতে ট্রেন চালাতে হয়,তাই বেশীর ভাগ সময়েই সিডিউল সময় অনুযায়ী গন্তব্যে পৌছতে পারে না লালমনি এক্সপ্রেস ও রংপুর এক্সপ্রেস। ফলে যাত্রীদের কাছে রংপুর এক্সপ্রেস ও লালমনি এক্সপ্রেস বিড়ম্বনার অপর নাম।

উত্তরাঞ্চলের লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া এই পাঁচ জেলার মানুষের একমাত্র ঢাকাগামী আন্তঃনগর এক্সপ্রেস ট্রেন লালমনি ও রংপুর এক্সপ্রেস।এছাড়া নাটোর, সিরাজগঞ্জ,টাঙ্গাইল, জেলার মানুষ নিয়মিত এই ট্রেনদুটিতে যাতায়াত করে থাকেন।

ঈদে ঘরমুখো মানুষের চাপ সামলাতে পুরাতন ইরানি কোচ যা দীর্ঘদিন অকেজো অবস্থায় পড়ে ছিল তা সৈয়দপুর ওয়ার্কশপে ছয় কোটি টাকা ব্যায় করে গত ০৬ই জুন ঢাকঢোল পিটিয়ে লালমনি এক্সপ্রেসে সংযোজন করা হয়।

যাত্রা শুরু হবার ছয় দিনের মাথায় এয়ার ব্রেক সিষ্টেম ও এলার্ম সিগন্যাল ত্রুটি ধরা পরায় ১৩ জুন মেক্যানিক্যাল বিভাগ মেরামত কৃত ইরানি কোচগুলো অযোগ্য ঘোষনা করে।এদিকে ১৯৮৬সালের পুরাতন দুইসেট ইরানি কোচ দিয়ে লালমনি এক্সপ্রেস চললেও লোকমেটিভ ইঞ্জিন স্বল্পতায় এর সুফল যাত্রী সাধারন পাচ্ছেন না। দুইসেট কোচের জন্য দুটি লোকমেটিভ ইঞ্জিন দরকার। যাত্রীদের দাবির মুখে আজও একটি লোকমেটিভ ইঞ্জিন লালমনি এক্সপ্রেসের জন্য বরাদ্দ না হওয়ায় বঞ্চনা বৈষম্য পিছু ছাড়ছে না।

সদ্য ঘোষিত বিভাগীয় শহড় রংপুর থেকে একটি মাত্র এক্সপ্রেস ট্রেন চলে, তাও আবার পুরাতন কোচ দিয়ে চলছে।ফলে সবশ্রেনীর যাত্রীদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে রংপুর এক্সপ্রেস। রংপুরের পুত্রবধু প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরিন শারমিন এই অঞ্চল থেকে নির্বাচিত, জাতীয় সংসদের বর্তমান প্রধান বিরোধীদল ও সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ এই রংপুর অঞ্চলের সন্তান এবং এই রংপুরের ভোটে নির্বাচিত হয়ে তারা সরকার গঠনে ভূমিকা পালন করেন। অথচ এত ভিভিআইপি রাজনৈতিক অভিভাবক থাকা সত্বেও রংপুর ও লালমনিরহাটের মানুষ দুটি নতুন আন্তঃনগর ট্রেনের দাবী করে আসলেও বাশ্তবায়নে অগ্রগতি না থাকায় হতাশ। রংপুর বিভাগীয় শহড় হিসেবে একটি সম্পূর্ন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত লাল সবুজ কোচের বহর দিয়ে এক্সপ্রেস ট্রেন চালু এখন সময়ের দাবী।এ নিয়ে রংপুর বিভাগ উন্নয়ন কমিটির ব্যানারে বিক্ষোভ হয়েছে একাধিক বার তথাপি এই দাবী বাশ্তবায়নে পদক্ষেপ না নেওয়ায় এই অঞ্চলের মানুষ ক্ষুদ্ধ।

লালমনিরহাট রেল বিভাগের আওতায় বর্তমান প্রত্যেকটি ট্রেন লাভজনক অবস্থায় রয়েছে। লালমনিরহাট থেকে বুড়িমারি রেলপথ সংস্কার করার পর বুড়িমারি শুল্ক বন্দরের সাথে যোগাযোগ ব্যাবস্থা উন্নয়ন হওয়ায় ট্রেনের যাত্রী ৭০%বৃদ্ধি পায়।সান্তাহার থেকে ছেড়ে আসা বুড়িমারি গামী করতোয়া এক্সপ্রেস ট্রেনটি সময় মেনে চলাচল করায় যাত্রীর চাপ বেড়েছে রেল ভ্রমণে, সেই সঙ্গে শতভাগ আয় নিশ্চিত হয়েছে। বুড়িমারি থেকে একটি আন্তঃনগর এক্সপ্রেস ট্রেন চলাচলে দাবী করে আসছে এই অঞ্চলের মানুষ, রেল মন্ত্রী মুজিবুল হক প্রতিশ্রুতি দিলেও সেটা বাশ্তবায়নে এখনও সম্ভবনা না দেখে মানুষ হতাশ। করিডোর এক্সপ্রেস অথবা তিনবিঘা এক্সপ্রেস ট্রেনটি নতুন কোচ ও লোকমেটিভ ইঞ্জিন দিয়ে অতি অল্পসময়ে চালু হবে এমন প্রত্যাশা এই অঞ্চলের মানুষের। তিনবিঘা এক্সপ্রেস ট্রেনটি সকাল ছয়টানাগাদ বুড়িমারি থেকে ছেড়ে সকাল আটটা ত্রিশ মিনিট অথবা নয়টা নাগাদ বিভাগীয় শহড় রংপুর থেকে যাত্রী নিয়ে বিকাল চারটা নাগাদ কমলাপুর ষ্টেসনে পৌছলে যাত্রী শতভাগ হবে এবং লাভজনক হবে বলে এই অঞ্চলের মানুষ মনে করেন।

গত আটবছরে রেল বিভাগের উন্নয়নে যত টাকা বরাদ্দ হয়েছে, সেখানে পুর্ব এবং পশ্চিমাঞ্চল বরাদ্দের তুলনামূলক চিত্র দেখলে পশ্চিমাঞ্চলের লালমনিরহাট রেল বিভাগ বরাবরই বৈষম্যের স্বীকার হয়েছে। দেশের পশ্চাদপদ উত্তরাঞ্চলের মানুষকে পিছনে রেখে সমুন্নত উন্নয়ন এবং মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে ২০২১সালে লক্ষ্যে পৌছানো চ্যালেঞ্জ হবে বলে বিশিষ্টজনেরা মনে করেন।

তাই সকল বৈষম্য দূর করে লালমনিরহাট রেল বিভাগের আওতায় কুড়িগ্রাম জেলার জন্য একটি আন্তঃনগর এক্সপ্রেস, রংপুর বিভাগীয় শহড়ের জন্য নতুন একটি আন্তঃনগর এক্সপ্রেস, বুড়িমারি শুল্ক বন্দর থেকে নতুন তিনবিঘা এক্সপ্রেস চালু করে এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবী পুরন করা হউক এবং সমুন্নত উন্নয়নে এই অঞ্চলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হউক বলে মনে করেন বিশিষ্ট জনেরা।