Opu Hasnat

আজ ২৩ সেপ্টেম্বর রবিবার ২০১৮,

সৈয়দপুরে ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নে এরা বিভোর নীলফামারী

সৈয়দপুরে ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নে এরা বিভোর

কেউ পিতা কেউবা মা হারা। তবে ববিতা (১৫), পিংকি (১২) ও সাদিয়া (১৫)। এরা তিনজনই এতিম। এরা ভিন্ন পরিবারের হলেও কষ্ট ও স্বপ্ন তাদের এক। দারিদ্র্য আর রক্ষণশীলতা পেরিয়ে তাই ছুটছেন তারা দেশের নারী ক্রিকেটার হতে। তাদের দেখাদেখি এ শহরের ক্রিকেট একাডেমি ও ক্লাবগুলোতে নারী ক্রিকেটারের সংখ্যা বাড়ছে।

পিংকি সৈয়দপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণীতে পড়ে। বাবা নেই। মা কাজ করেন ঢাকার গার্মেন্টসে। নানা-নানি ও খালা মিলে তার লেখাপড়ার ব্যয় বহন করে। মধ্যম গড়নের দুষ্ট ও চঞ্চল প্রকৃতির এ মেয়েটি রাইজিং স্টার একাডেমি দলের মিডল অর্ডারে একজন নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যান। আপন মেধা ও পরিশ্রমে সুযোগ পেয়েছেন বিকেএসপিতে। করেছেন এক মাসের অনুশীলন। আজ সে পরিপক্ব না হলেও বয়সভিত্তিক নারী দলের অভিজ্ঞ ক্রিকেটার। সৈয়দপুর স্টেডিয়াম, রেলওয়ে মাঠ বা ফাইভ স্টার মাঠ। এ শহরের সকল মাঠের পিচই সে রানের ফুলঝুরি ছুটিয়ে জিতিয়েছে বহুবার। দলকে কখনও একাই টেনে তুলেছেন খাদের কিনারা থেকে। টি-২০ কিংবা ওয়ানডে ক্রিকেট। সব ফরম্যাটে এ বয়সেই সফলতার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে পিংকি। এখন শুধু শ্রম দিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনছে স্বপ্নের ক্রিকেট রানিদের সঙ্গে কবে দেখা হবে তার।

ববিতা রাণী সৈয়দপুর উপজেলার বাঙ্গালীপুর ইউনিয়নের বুজারী পাড়ার স্বর্গীয় রবীন্দ্রনাথ রায়ের ছোট মেয়ে। দিনমজুর পিতা ২০১৬ সালে রোগ যন্ত্রণা ভুগে মারা যান। এতে তাদের সংসারে চরম দৈন্যদশা ভর করে। বাধ্য হয়ে মা সুশিলা রানী (৫৪) অন্যের বাড়ি ও জমিতে মজুরের কাজ করেন। সারাদিন হার ভাঙ্গা শ্রমের মজুরি থেকে বাঁচিয়ে ববিতার পড়ালেখার ব্যয় মেটাতে হয়। ক্রিকেটিও মেধায় ভালভাবেই এসএসসি পাস করে। হালকা-পাতলা গড়নে দীর্ঘকায় না হলে ক্রিকেটে মনোযোগী ববিতা। তার ক্রিকেটিও দুর্বলতা দেখে প্রতিবেশী ভাই ববিতাকে চৌমহুনি ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি করেন। মাঠে কঠোর অনুশীলন করে নিজেকে দেশের পেস বোলার রুমানার মতো করতে স্বপ্ন দেখেন। তাই এ একাডেমি ছেড়ে আরও ভালও করার প্রবণতায় ভর্তি হন সৈয়দপুর শহরের রাইজিং একাডেমিতে। এখানে নিজেকে পাল্টিয়ে ফেলেছে ববিতা। আর এর মুল্যায়ন হিসেবে ডাক পায় বিকেএসপিতে। সেখানে নীলফামারী জেলার হয়ে সুযোগ পায় ববিতা রানী। এক মাসের প্রশিক্ষণ শেষে বাড়িতে ফিরেছেন। খুবই উচ্ছ¡সিত। কারণ সেখানে জাতীয় পর্যায়ের কোচ ফাতেমা-তুজ-জোহরাসহ অন্য দুজনের প্রশিক্ষণে নিজেকে মেলে ধরতে পারবেন বলের গতি ছোটাতে পারবেন। শহরের বাঙ্গালীপুর নিজপাড়ার রাজমিস্ত্রি আনোয়ারুল হকের ৩য় সন্তান সাদিয়া। তিন ভাই বোনের মধ্যে সে সবার ছোট। তাই অতি আদরের সন্তান দরিদ্র পিতার কাছে এ মেয়েটি। বর্তমানে সৈয়দপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীতে সে পড়ছে। সাদিয়া আক্তার (১৫)। এরই মধ্যে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলার মাঠেও সমান তালে দাপটের সঙ্গে এগিয়ে চলছে।

তবে চার বছর আগে সাদিয়ার মা রেহেনা বেগম না ফেরার দেশে পাড়ি জমালে বাবা ও বড় ভাই-বোনের স্নেহেই লালিত হচ্ছেন সাদিয়া। মূলত তাদের উৎসাহে ছোটবেলা থেকে খেলাধুলার প্রতি অনুরক্ত। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ ছিল তার প্রিয় স্থান। সেখানে নিয়মিত চর্চায় একক ইভেন্টগুলোতে প্রথম হতো। তাকে নিয়ে দলীয় ইভেন্টের ক্রিড়ায় পারদর্শিতা দেখিয়েছে বহুবার। তাই সে মাঠের একজন মনোযোগী ক্রিকেটার।
সৈয়দপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্রীড়া বিভাগের শিক্ষক গোলাম মোস্তফা জানান, ক্রিকেট, ফুটবল, হ্যান্ডবল ও ভলিবল। সব দলীয় ইভেন্টে সে সেরা। আবার ১০০ মিটার, ২০০ মিটার দৌড়, লংজাম্প ও সাতারেও রয়েছে স্থানীয় রাজত্ব। ৩৪টি সনদের পাশাপাশি মুকুটে রয়েছে বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থার ১০০ মিটার প্রতিযোগিতার স্বর্ণের পালক।
সাদিয়ার বাবা আনোয়ারুল হক অশ্রæসিক্ত চোখে জানান, আমার মা হারানো এতিম মেয়ে ভাল খেলে সোনার মেডেল পেয়েছে। এ আনন্দে একটা নতুন জামা চাইছিল। অভাবের সংসারে কিনতে পারি নাই।

সাদিয়া জানায়, জেতার জন্য খেলি। সবসময় নির্ভয়ে সব উজাড় করে শতভাগ চেষ্টা করি মাঠে। এতেই সফলতা পাই। তবে মেয়েরা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খেলাধুলাকে এড়িয়ে চলে। আমি একটু আলাদা। তাই স্বপ্ন পুরনে খেলার মাঠে নিজেকে বহুদূরে নিতে চান ক্রিকেটার হিসেবে। তাই স্থানীয় রাইজিং স্টার একাডেমির ফাইভ স্টার মাঠে নিয়মিত অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছেন। ব্যাটে-বলে বিশ্বসেরা হওয়া সাকিব আল হাসানকে আইডল মেনে নিজেকে নিয়ে যেতে চায় পান্না ঘোষ, জাহানারার মতো দেশ সেরা নারী ক্রিকেটারদের কাতারে। রুমানার মতো। এমন স্বপ্নে সর্বদাই চোখ ছলছল করে ববিতার।

বাংলাদেশ জাতীয় প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলের অন্যতম সদস্য ইমরান বলেন, এই মেয়েরা মাঠে যেভাবে শ্রম দিচ্ছে। অবশ্যই তারা ভবিষ্যতে বাংলাদেশ নারী জাতীয় ক্রিকেট দলের অংশ হতে পারবে। কারণ আমরা তাদের নিয়মিত পরিচর্যায় রেখেছি।

রাইজিং স্টার একাডেমির কোচ জামিউল ইসলাম বাবলু জানান, ক্রিকেটের ব্যাকরণ শেখানো হচ্ছে মাঠে। বলের সুতো কিংবা এর বাইরে গ্রিপ করা, ব্যটসম্যানের দুর্বল দিক চিহ্নিত করে লাইন ও লেংথ ঠিক রেখে সুইংয়ের মিশ্রণে বল ফেলাসহ অনেক কিছুই শেখানো হয়েছে। নিজস্ব স্টাইলে বোলিং, ব্যাটিং করছে। এতে ছেলেদের সঙ্গে খেলে ব্যাপক সফলতা পাচ্ছে। বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক উইকেট কীপার ও সৈয়দপুর সিটি ক্রিকেট ক্লাবের কোচ মুখতার সিদ্দিকী জানান, ক্রিকেটের প্রতি এদের আগ্রহের কারণে তারা উঠে আসবে। এ নিয়ে প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রাকিব খান বলেন, সাদিয়া, ববিতা ও পিকিং এরা তিনজনই মেধাবী ও পরিশ্রমি। তারা আমাদের এলাকার নারী ক্রিকেটের অহংকার। কারণ খেলার মাঠে এখনও নারীরা যথেষ্ট পিছনে। নানান প্রতিকূলতা তাদের বাধ্য করেছে। আমরা ব্যক্তিগতভাবে এই তিন মেয়েকে নেয়ায় এখন অনেকে এ একাডেমিতে ভর্তি হয়ে নিয়মিত প্রাকটিসে আসছে।
এ তিন কন্যারা ভালবাসেন ক্রিকেট, পরিবার ও দেশকে। তাই ক্রিকেটকে নিয়ে পরিবার ও দেশের জন্য এ অবস্থান থেকে নিজেদের নিয়ে যেতে চায় বহুদুর।