Opu Hasnat

আজ ১৬ নভেম্বর শুক্রবার ২০১৮,

স্যাটেলাইট, মহাকাশে ঘুরবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১ : অধ্যাপক ম. হালিম মতামত

স্যাটেলাইট, মহাকাশে ঘুরবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১ : অধ্যাপক ম. হালিম

আগামী ১০ মে মহাকাশে যাত্রা করবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। আমেরিকার অঙ্গরাজ্য ফ্লোরিডার ক্যাপ ক্যানার্ভেল প্রক্ষেপন কেন্দ্র (কেনেডি স্পেস সেন্টার) থেকে এলেন ম্যাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেস এক্স কোম্পানীর ফালকন-৯ নামক রকেট স্যাটেলাইটটি বহন করে নিয়ে যাবে মহাকাশে। আমরা আশা করছি এ যাত্রাকাল সুন্দর দৃশ্যটি টিভির মাধ্যমে দেখতে পাবো। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে লাল সবুজের পতাকাবাহী বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপন দৃশ্যটি উদ্ধোধন করবেন। এটাই হবে মহাকাশে ঘূর্ণনরত বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট। এ দিনটিই হবে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার একটি মাইলফলক।

স্যাটেলাইটের বাংলা প্রতিশব্দ কৃত্রিম উপগ্রহ। পৃথিবী থেকে নির্দিষ্ট উচ্চতায় গিয়ে বৃত্তাকার বা উপবৃত্তাকার পথ বজায় রেখে যে বস্তু বা যন্ত্রযান পৃথিবীর চারদিকে ঘুরতে থাকে তাকে আমরা কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট বলে থাকি। এ ধরণের উপগ্রহ থেকে দীর্ঘকালীন সেবা পেতে হলে তাকে ভূস্থির উপগ্রহে পরিনত হতে হবে। আমরা জানি পৃথিবী নিজ অক্ষে ২৪ ঘন্টায় লাটিমের ঘূর্ণনের মত আবর্তন করে। এ অবস্থায় পৃথিবী উত্তর দক্ষিন বরাবর কল্পিত অক্ষকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশ প্রতি সেকেন্ডে ৪৬৫ মিটার সরে যাচ্ছে। এখন পৃথিবীর ঘূর্ণনের সমান তালে যদি একটি কৃত্রিম উপগ্রহ উর্ধ্বাকাশে নির্দিষ্ট উচ্চতায় পৌঁছে ঐ একই কৌনিক দ্রুতিতে সর্বদা ঘুরতে থাকবে তখন তাকে পৃথিবীর বুক থেকে স্থির বলে মনে হবে। এক্ষেত্রে পৃথিবীর অক্ষের সাপেক্ষে তার কৌনিক আবর্তন মহাকাশের স্যাটেলাইটের কৌনিক আবর্তন একই থাকবে। এর ফলে স্যাটেলাইটটি ভূস্থির স্যাটেলাইটে পরিনত হবে।

মহাকাশে পৃথিবীর ৫৬টি দেশে নিজস্ব একাধিক ভূস্থির উপগ্রহ প্রেরণ করে যোগাযোগ সহ বিভিন্ন ধরণের সেবা গ্রহন করছে। বাংলাদেশও নিজস্ব উপগ্রহ মহাকাশে স্থাপন করে ৫৭ তম দেশ হিসাবে স্যাটেলাইট এর মালিক হয়ে আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট সংস্থার সদস্য হবে। এখানে উল্লেখ করতে চাই স্বাধিনতার পর ১৯৭৫ সালে মহাকাশে স্থাপিত বিদেশী একটি স্যাটেলাইট থেকে নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে সেবা গ্রহণ করে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থার শুভ সুচনা করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৪ জুন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান রাঙ্গামাটির কাউখালী থানার (উপজেলা তখন হয়নি) বেতবুনিয়ার অবস্থিত প্রথম উপগ্রহ ভূকেন্দ্র উদ্বোধন করেন। আমেরিকার কমসেট নামক টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানীর মালিকানাধীন ইনটেলসেট-৪ নামে একটি কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে টেলিফোন, টেলেক্স, টেলিভিশন তথ্য গ্রহণ ও প্রেরণের জন্য ঐ ভূ কেন্দ্রটি উদ্বোধন করা হয়। আজ আমরা গর্বিত আমাদের প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ৪২ বছর পরে নিজস্ব অর্থে ক্রয়কৃত নিজ মালিকাধীন একটি কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট মহাকাশে যাচ্ছে। খুব শীঘ্রই তার সাথে ঢাকার জয়দেবপুরে নতুন ভাবে গড়ে তোলা উপগ্রহ ভূকেন্দ্রে সাথে সংযোগ স্থাপিত হবে।

এ স্যাটেলাইটটি নির্মাণের জন্য  ২০১৫ সালের নভেম্বরে থ্যালেস এ্যালিনিয়া স্পেসের সাথে ২৭৬৫ কোটি টাকা প্রদানের ব্যায় করার চুক্তি করা হয়। এটিই মূলত একটি যোগাযোগ উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট। বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ ও নানা তথ্য প্রদান ও গ্রহণের জন্য এতে ৪০টি ট্রান্সপোন্ডার রয়েছে। ট্রান্সপোন্ডার হচ্ছে ভূমি থেকে প্রেরিত সংকেত গ্রহণ ও বিবর্ধিত করে পূনরায় প্রেরণ করার যন্ত্র। ২০ টি যন্ত্র বাংলাদেশ তার নিজস্ব কাজে ব্যবহার করবে। বর্তমানে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বিদেশী স্যাটেলাইট এর নিকট থেকে র্ফ্রিকোয়োন্সি ভাড়া নিতে ১১৬ কোটি টাকা ব্যয় করছে। আমাদের নিজস্ব স্যাটেলাইট মহাকাশে স্থাপিত হলে ঐ অর্থ দেশেই থাকবে। এছাড়া স্যাটেলাইটে অবস্থিত ২০ টি ট্রান্সপোন্ডার শ্রীলংকা, ফিলিপাইন, নেপাল, ইন্দোনেশিয়ার কাছে ভাড়া দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারবো। এতে বিনিয়োগের অর্থও অনেকটা উঠে আসবে।

গত ৩১ শে মার্চ আমাদের বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ বিমানে করে ফ্রান্স থেকে আমেরিকার ফ্লোরিডায় নেয়া হয়েছে। এখানেই লানচিং প্যাড থেকে স্পেস এক্স কোম্পানীর ফালকন-৯ নামক রকেটের মাধ্যমে উর্ধাকাশে পাঠানো হবে। স্যাটেলাইট সহ রকেটটির ওজন হবে প্রায় ৮৩০০ কিলোগ্রাম। এর আগে বাংলাদেশ সরকার  রাশিয়ার ইন্টার স্পুটনিং কোম্পানীর নিকট থেকে ২১৯ কোটি টাকার বিনিময়ে একটা নির্দিষ্ট অরবিটাল প্লট ভাড়া নিয়েছে। যাকে মহাকাশ বিজ্ঞানীর ভাষায় স্লট বলা হয়। মহাকাশে ৮০টির বেশি দেশের প্রায় ৬০০০ হাজারেও বেশি স্যাটেলাইট বিভিন্ন অরবিটে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এরমধ্যে ৩০০০ এর বেশি কার্যকর রয়েছে। অবশিষ্ট অনেকগুলো অকার্যকর অবস্থায় আছে। এছাড়া কিছু নষ্ট স্যাটেলাইট বর্জ্যরুপে মহাকাশে অবস্থান করছে।

ফালকন-৯ রকেটটির ৩টি অংশ রয়েছে। কেন্দ্রীয় লম্বা কোরটির দুপাশে দুটি বোস্টার কোর রয়েছে। রকেটটির দৈর্ঘ্য ৭০ মিটার এবং চওড়া ১২ মিটার। রকেটটির ৩টি কোরে ২৭টি ইঞ্জিন রয়েছে। প্রতিটি ইঞ্জিন পর্যায়ক্রমে চালু হলে ২২৮১৯ কিলো নিউটন বল প্রয়োগে রকেট টাকে নিম্নদিকে ধাক্কা দিয়ে নিউটনের তৃতীয় সুত্রানুযায়ী উর্ধাকাশে পাড়ি দিবে। রকেটটির কেন্দ্রীয় কোরের শীর্ষে একটি কক্ষে থাকবে লাল সবুজের পতাকাবাহী বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট। রকেটটি পর্যায়ক্রমে ৩৬০০০ কিলোমিটার উর্দ্ধে বায়ুমন্ডলের বাইরে গিয়ে স্যাটেলাইটটি কে ভূপৃষ্টের সমানতরালে গতিশীল করবে এবং রকেট থেকে আলাদা হয়ে যাবে। এ সময় স্যাটেলাইটটির সেকেন্ডে ৩ কিলোমিটার গতিতে গতিশীল থেকে পৃথিবীর একটি কৃত্রিম উপগ্রহে পরিনত হবে। অবশ্য স্যাটেলাইটটিকে যথাস্থানে স্থাপিত করে মূল রকেটির ব্যাপক অংশকে অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হবে। স্পেস এক্স কোম্পানীর মহাকাশ বিজ্ঞানীরা বলছেন উৎক্ষেপনের ১৫ দিন পরে স্যাটেলাইটটি তার নির্ধারিত গন্তব্য স্থানে পৌঁছে যাবে। স্যাটেলাইটের মধ্যে অবস্থিত সকল যন্ত্র গুলোকে কার্যকর অবস্থায় রুপ নিতে  প্রায় ২ মাস সময় লাগতে পারে। স্যাটেলাইটের সাথে সংযোজিত সৌর প্যানেল থেকে প্রাপ্ত শক্তি স্যাটেলাইটের মধ্যে যন্ত্র সমূহ কে কার্যকর রাখবে। ফ্রান্সের নির্মান প্রতিষ্ঠান থ্যালেস এ্যালিনিয়ার বিজ্ঞানীরা আশা করছেন স্যাটেলাইটি ১৫ থেকে ২০ বছর কার্যকর থাকবে।

পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির অবস্থান ৮৮০৪৫ পূর্ব দ্রাঘিমা থেকে ৯২০৪১ পূর্ব দ্রাঘিমা পর্যন্ত বিস্তৃত। স্পেস এক্স কোম্পানীর মহাকাশ বিজ্ঞানীরা বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটটিকে আমাদের ক্রয়কৃত অরবিটে ১১৯.১০ দ্রাঘিমা স্থাপন করবে। এ অঞ্চলটি ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন দেশের উর্ধাকাশে অবস্থিত। সামান্য কৌনিক ভাবে অবস্থান করলেও স্যাটেলাইটের পূর্ণ নিয়ন্ত্রন আমাদের হাতেই থাকবে। স্যাটেলাইটি ৩৬০০ কিলোমিটার উর্দ্ধে অবস্থান করে প্রতি সেকেন্ডে সর্বদা ৩ কিলোমিটার পথ চক্রাকারে অতিক্রম করবে। বাংলাদেশ সরকারের ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রন কমিশন বা  বিটিআরসি কর্তৃক এ বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়িত হবে। স্যাটেলাইটটিকে প্রথমে জয়দেবপুরে অবস্থিত উপগ্রহ ভূকেন্দ্রের সাথে সংযোগ স্থাপন করা হবে। এরপর পরবর্তিতে বেতবুনিয়ার সাথে সংযুক্ত হবে। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় বাংলাদেশের তথ্য, প্রযুক্তি ও মহাকাশ যোগাযোগের ক্ষেত্রে দ্বারা একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটবে। উন্নয়নশীল বিশ্বের অগ্রযাত্রায় আমরাও এগিয়ে যাবো।                                                                                                

লেখক-  সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের পদার্থ বিজ্ঞানের প্রাক্তন শিক্ষক