Opu Hasnat

আজ ২২ অক্টোবর সোমবার ২০১৮,

উত্তরা ইপিজেড : কারখানাগুলো দূর করেছে এজনপদের মঙ্গা শব্দটি নীলফামারী

উত্তরা ইপিজেড : কারখানাগুলো দূর করেছে এজনপদের মঙ্গা শব্দটি

নীলফামারীর উত্তরা ইপিজেড থেকে সৈয়দা রুখসানা জামান শানু : বছরে সারা বিশ্বে প্রায় সাড়ে তিন কোটি পরচুলা (উইগ) রপ্তানি করছে এভারগ্রিন নামে হংকংভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান। এতে আয় হচ্ছে দেড় কোটি মার্কিন ডলারের বেশি। এটির কারখানা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর-নীলফামারী সড়কে স্থাপিত একটি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় (ইপিজেড)। পরচুলা তৈরীর একটি মাত্র কারখানাতে কাজ করেন ১৫ হাজার শ্রমিক। তাতে রয়েছে শতকরা ৬৫ভাগ নারী শ্রমিক এবং শতকরা ৩৫ভাগ পুরূষ শ্রমিক। এ সমস্ত শ্রমিককেরা উত্তরা ইপিজেড সঙলগ্ন  আশপাশের ১০টি গ্রামের অধিবাসী। সৈয়দপুর শহর থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে সংগলশী ইউনিয়নে ২০০১খ্রি: যখন উত্তরা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ চালু হয়, তখন এলাকাটি ছিল একটি নিভৃত মঙ্গাপীড়িত জনপদ। এখন ১৫টি দেশি-বিদেশি কোম্পানি ১৪০টি প্লটে কারখানা স্থাপন করেছে। এর মধ্যে আটটি হংকংভিত্তিক কোম্পানি, একটি যুক্তরাজ্যের। বাকিগুলি বাংলাদেশি। সোয়েটার তৈরির কারখানা যেমন আছে, তেমনি আছে চশমা, এমনকি কফিন তৈরির কারখানাও। ওয়েসিস নামের ব্রিটিশ কোম্পানি এখানে গ্রামের নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করছে বাঁশ ও বেতের কফিন। রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) তথ্য অনুযায়ী, এসব কারখানা প্রতিবছর গড়ে ১৮ কোটি ৮৮ লাখ মার্কিন ডলার অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি করে। 

এ বিষয়ে কথা হয়, উত্তরা ইপিজেডে দ্বায়িত্বরত (কর্মাশিয়াল অপারেশন এন্ড ইনডাসট্রিয়াল রিলেশন) ডিপুটি ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ এর সঙ্গে। তিনি জানান, উত্তরা ইপিজেডে এখন কাজ করছেন ত্রিশ হাজার শ্রমিক। এদের জন্য প্রতিমাসে বেতন হিসাবে ব্যয় হয় ত্রিশকোটি টাকা। এই ইপিজেডকে ঘিরে শহরের আনাচে কানাচে গড়ে উঠেছে অন্তত ২০টি দেশি-বিদেশি কারখানা। সেগুলোয় আরও কয়েক হাজার শ্রমিক কাজ করেন। এসব কারখানা বদলে দিয়েছে এলাকাটিকে। আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় গ্রামের কৃষি শ্রমিকেরা এখন কারখানা-শ্রমিক। নিস্তরঙ্গ গ্রামগুলোয় এখন ভিন্ন ধরনের কর্মব্যস্ততা। গৃহস্থ বাড়িগুলোয় এখন সচ্ছলতার ছাপ।

স্থানীয় লোকজন জানান, নীলফামারীর কৃষি শ্রমিকেরা বছরের বেশির ভাগ সময় কাজের অভাবে অনাহারে-অর্ধাহারে দিনযাপন করতেন। অনেকে কাজের সন্ধানে জেলার বাইরে যেতেন। এখন সে অবস্থা বদলে গেছে। এখন বরং আশপাশের কয়েকটি জেলার লোকজন এখানে এসে ইপিজেডে কাজ করে নিজে যেমন সংসারে উন্নয়ন এনেছেন, তেমনি এলাকার মঙ্গা শব্দ দূর করেছেন। 

সংগলশী ইউনিয়নে উত্তরা ইপিজেড এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, শ্রমিকেরা সকাল সাড়ে ছয়টা থেকে দলে দলে প্রবেশ করছেন কারখানায়। মানুষের এ এক বিরাট স্রোত। কেউ সাইকেলে, কেউ মোটরসাইকেলে, কেউ ইজিবাইকে আবার কেউ-বা হেঁটে। সময় মেপে কারখানায় ঢুকতে হবে। ব্যস্ত শ্রমিকদের পেছনে ফিরে তাকানোর সময় যেন নেই।

সকাল সাতটার মধ্যে প্রায় সব কারখানার শ্রমিকেরা ঢুকে যান নিজ নিজ কর্মস্থলে। বেলা ১২টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত দুপুরের খাবারের জন্য কারখানাগুলো সাময়িক বন্ধ থাকে। দিনভর কাজ শেষে বিকেল চারটা থেকে একইভাবে বের হতে থাকেন বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা। বিকেল সাড়ে পাঁচটার মধ্যে সব শ্রমিক বের হয়ে বাড়ীর পানে ছোটেন।  

একসঙ্গে ৩০ হাজার শ্রমিকের এই আসা-যাওয়ার কারণে সকালে আর বিকেলে দুই দফায় কারখানার সামনের রাস্তায় রীতিমতো যানজট লেগে যায়। শুধু কারখানার শ্রমিকদের আনা-নেওয়াকে কেন্দ্র করে ইজিবাইকের রমরমা ব্যবসা গড়ে উঠেছে।

কারখানার গেটে কথা হয় ভ্যানচালক আজিনুর ইসলামের (৩০) সঙ্গে। তাঁর বাড়ি এখান থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে চড়াইখোলা ইউনিয়নের বেঙমারী গ্রামে। স্ত্রী কমলা বেগম প্রায় দুই বছর যাবৎ ইপিজেডের লেদার কারখানা ভেনচুরায় কাজ করছেন। প্রতি মাসে স্ত্রীর আয় হয় সাত থেকে আট হাজার টাকা। তাঁর আয়ের চেয়েও স্ত্রীর আয় বেশি। প্রতিদিন ভোরে তিনি নিজের ভ্যানে স্ত্রীকে দিয়ে যান এবং বিকেলে নিতে আসেন। স্ত্রীকে কারখানায় আনা-নেওয়ার সময় ওই এলাকার অন্য শ্রমিকেরাও আসেন তাঁর ভ্যানরিকশায়। এতে আজিনুরের প্রতি মাসে বাড়তি আয় হয় প্রায় ছয় হাজার টাকা। আজিনুর বলেন, আগে সংসারে অনটন লেগে থাকত। এখন মাস শেষে বেশ সঞ্চয় হচ্ছে। 

জেলা সদরের ইটাখোলা ইউনিয়নের হরিবল্লব গ্রাম। ওই গ্রামের বেশ কিছু নারী ও পুরুষ ইপিজেডে কাজ করছেন। পুরো গ্রামেরই চেহারা পাল্টে গেছে।  কারখানা ছুটির দিনে ওই গ্রামে গিয়ে কথা হয় বাবুল চন্দ্র রায়ের (৪০) সঙ্গে। তিনি জানান, আগে তিনি কৃষি শ্রমিক ছিলেন। ইপিজেড হওয়ার আগে ৬০ থেকে ৭০ টাকায় দৈনিক হাজিরা পেতেন। বছরে তিন থেকে চার মাস কাজ জুটত। বাকি সময় রিকশা চালাতে হতো। নিজের ভিটাটুকুও ছিল না। ইপিজেড হওয়ার পর তার তিন মেয়ে সেখানে কাজ পায়। তারা প্রতি মাসে প্রায় ৩০ হাজার টাকা রোজগার করছে। এখন নিজের একটা ভিটা হয়েছে। তিনটি টিনের চালাঘর দিয়েছেন।

ওই গ্রামের আনোয়ারুল ইসলাম (২৪) ও তাঁর স্ত্রী পারভীন আকতার (২২) এভারগ্রিনে কাজ করেন। দুজনে মিলে আয় করেন মাসে ১৫ হাজার টাকা। আনোয়ারুল বলেন, তিনি দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন, স্ত্রী অষ্টম। প্রায় পাঁচ বছর ধরে কারখানায় কাজ করছেন। মোটরসাইকেল কিনেছেন, বাড়ি পাকা করার কাজ শুরু করেছেন।

বিকেল চারটার দিকে স্বামী-স্ত্রী মিলে একটি বাইসাইকেলে চেপে ইপিজেডের গেট দিয়ে বের হচ্ছিলেন পরিমল রায় (২৩) ও লক্ষ্মী রানী রায় (১৮)। গন্তব্য ১০ কিলোমিটার দূরে কুন্দুপুকুর ইউনিয়নের পূর্ব শালহাটি গ্রাম। পরিমল জানান, স্বামী-স্ত্রী দুজনই এভারগ্রিন কোম্পানিতে কাজ করেন। তিনি প্যাকিংয়ের কাজ করেন। আর স্ত্রী তৈরি করেন পরচুলা। পরিমল আগে বর্গাচাষী ছিলেন। এখন নিজের দুই বিঘা জমি অন্যদের বর্গা দিয়েছেন।

পরচুলা তৈরির কারখানা এভারগ্রিনের উপমহাব্যবস্থাপক সুব্র সরকার জানান, তাঁদের কারখানার ১৫ হাজার শ্রমিকের ৬৫ শতাংশ নারী। গত বছর পরচুলা রপ্তানি করে তাঁর কোম্পানি দেড় কোটি মার্কিন ডলার আয় করেছে। তাঁরা তিন ধরনের পরচুলা তৈরি করেন। বেশির ভাগই কার্নিভ্যাল উইগ ও সিনথেটিক উইগ। মানুষের পরিত্যক্ত চুল দিয়েও কিছু পরচুলা তৈরি হয়। রঙ-বেরঙের কার্নিভ্যাল উইগ উৎসবের দিনে লোকে সখের বশে মাথায় পরে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর হিসাব থেকে দেখা যায়, সর্বশেষ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সারা দেশ থেকে ১ কোটি ৫৭ লাখ মার্কিন ডলার সমমূল্যের পরচুলা রপ্তানি হয়েছে। এর সিংহ ভাগই এভারগ্রিনর কারখানার। নীলফামারী শিল্প ও বণিক সমিতির সভাপতি এস এম সফিকুল আলম বলেন, একসময় এটি কৃষিনিভর" এলাকা ছিল। ধানকল ছাড়া কেউ শিল্পকারখানা দেখেনি। বছরের বেশির ভাগ সময় কৃষি শ্রমিকদের কাজ থাকত না। আর নারীরা ঘরে বসে দিন কাটাতেন। এখন নারী-পুরুষ সমানভাবে শিল্পকারখানায় কাজ করছেন। ওই ইপিজেডকে ঘিরে জেলার আনাচকানাচে গড়ে উঠছে রপ্তানিমুখী আরও বহু কারখানা। এখন বহুমুখী অর্থের" ঘূর্ণায়ন হচ্ছে।

এ বিষয়ে কথা বললে উত্তরা ইপিজেডের মহাব্যবস্থাপক মো. জোনাব আলী বলেন, ২০০১ সালে যখন উত্তরা ইপিজেড চালু হয়, তখন এটাকে ঘিরে খুব বেশি আশাবাদ ছিল না। উত্তরা সোয়েটার নামের একটিমাত্র কোম্পানি এখানে কারখানা স্থাপন করেছিল। এখন ১৪০টি প্লটে ১৫টি কোম্পানি কারখানা স্থাপন করে রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদন করছে।  আরও ৪০টি প্লট প্রস্তত আছে, যার বেশির ভাগ ইতিমধ্যে বরাদ্দ হয়ে গেছে। ইতমধ্যে চালু কোম্পানিগুলোই নতুন প্লটগুলোয় কারখানা সম্প্রসারিত করেছে।

কারখানা বৃদ্ধির ফলে এখানে বিদ্যুৎ-চাহিদাও বৃদ্ধি পেয়েছে উল্লেখ করে মহাব্যবস্থাপক বলেন, ‘ইপিজেডে এখন বিদ্যুৎ-চাহিদা ১৫ মেগাওয়াট। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি এখানে ১০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুতের সাব-স্টেশন করেছে। আমরা সেটি সম্প্রসারণের জন্য বলেছি।