Opu Hasnat

আজ ২৫ মে শুক্রবার ২০১৮,

গণপিটুনিতে ৩ জনের মৃত্যু নিয়ে নানা প্রশ্ন সারাবাংলা

গণপিটুনিতে ৩ জনের মৃত্যু নিয়ে নানা প্রশ্ন

পাবনার সাঁথিয়ায় অপহরণকারী ও ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে তিনজন নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ। কেন, কী কারণে, কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তা তদন্তে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নিহতরা আসলেই অপহরণকারী কিংবা ছেলেধরা ছিল কি না, তা নিয়েও দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। অপহরণের গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনির ঘটনা পরিকল্পিত কি না, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

এদিকে গণপিটুনিতে তিনজন নিহতের ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ৩ হাজার মানুষকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।

সাঁথিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহিদ মাহমুদ খান জানান, নিহত আলাউদ্দিন ওরফে আলালের ভাই রানা শেখ বাদী হয়ে মঙ্গলবার মধ্যরাতে মামলাটি দায়ের করেন। তবে মামলায় এখনো কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ।

বুধবার সকালে পাবনা জেনারেল হাসপাতাল মর্গে নিহতদের লাশ ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলেও জানান ওসি।

অপরদিকে গণপিটুনিতে নিহত তিনজনের নাম-পরিচয় নিশ্চিত করেছে পুলিশ। নিহতরা হলেন- নাটোর সদর উপজেলার লক্ষীপুর খোলাবাড়িয়া গ্রামের সুরুজ মিয়ার ছেলে প্রাক্তন ইউপি সদস্য আলাউদ্দিন ওরফে আলাল (৫০), দিনাজপুর সদর উপজেলার নয়নপুর কোতোয়ালি গ্রামের মৃত আব্দুল জলিলের ছেলে আসলাম হোসেন (৪৫) ও পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার কড়ইতলা গ্রামের সোনাই সরদারের ছেলে বগুড়ার বিহারি কলোনির বাসিন্দা আবু বক্কর সিদ্দিকী (৫০)। তারা পেশায় গরু ব্যবসায়ী ও পরস্পর আত্মীয় বলে জানা গেছে।

সরেজমিনে ঘটনাস্থল চতুরহাট ঘুরে স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মঙ্গলবার দুপুরে নগরবাড়ী থেকে ছেড়ে আসা বগুড়াগামী আলিফ পরিবহণ নামের একটি যাত্রীবাহী বাস বগুড়া-নগরবাড়ী মহাসড়কের সাঁথিয়া উপজেলাধীন করমজা চতুরহাট নামক স্থানে পৌঁছায়। এ সময় বাসে থাকা কতিপয় ব্যক্তি ঘটনার শিকার তিন ব্যবসায়ীকে জোড়পূর্বক গাড়ি থেকে নামিয়ে প্রতিভা বিপণন কেন্দ্রের সামনে নিয়ে নিজেরাই এলোপাথারি পেটাতে থাকে এবং তাদেরকে অপহরণকারী বলে চিৎকার করতে থাকে। এদিকে বেশ কিছুদিন ধরে সাঁথিয়া ও বেড়া উপজেলায় কয়েকটি অপহরণের ঘটনায় আতঙ্ক ও ক্ষোভ বিরাজ করছিল স্থানীয়দের মাঝে। তাই এদিন অপহরণকারী ধরার চিৎকারে হাটের লোকজনও কোনো কিছু না জেনে-শুনে তিনজনকে গণপিটুনিতে অংশ নেয়। এক পর্যায়ে ওই তিন গরু ব্যবসায়ী ঘটনাস্থলেই মারা যান।

করমজা চতুরহাটের কাঠ ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক জানান, কয়েকজন ব্যক্তি ওই তিনজনকে কলার চেপে ধরে ঘটনাস্থলে এনে অপহরণকারী বলে চিৎকার করে পেটাতে থাকে। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই ক্ষুব্ধ জনতাও মারপিটে অংশ নেয়।

প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিভা বিপণন কেন্দ্রের মালিক আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ রাজন বলেন, ‘ওই সময় আমি দোকানের কর্মচারির কাছ থেকে হিসাব বুঝে নিচ্ছিলাম। হঠাৎ তিন ব্যক্তিকে ধাওয়া করে আমার দোকানের সামনে অপহরণকারী বলে অনেক লোক বেধড়ক মারপিট করতে থাকে। এ অবস্থা দেখে আতঙ্কে দোকান বন্ধ করে চলে যাই।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, আলিফ পরিবহণ থেকে ওই তিনজনকে জোরপূর্বক নামিয়ে হাটের মধ্যে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর ‘অপহরণকারী’ ও ‘ছেলে ধরা’ বলে চিৎকার ও মারপিট করতে থাকে।

অপর একটি সূত্র জানায়, করমজা চতুরহাট জেলার অন্যতম বড় হাট। হাটটির অবস্থান সাঁথিয়া উপজেলার মধ্যে হলেও নিয়ন্ত্রণ করা হয় বেড়া পৌর প্রশাসন থেকে। সীমানা নিয়েও রয়েছে দ্বন্দ্ব ও জটিলতা। কোনো ঘটনা ঘটলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে তাই বেড়া ও সাঁথিয়া থানা পুলিশের মধ্যে দেখা দেয় দোটানা। আর এরই ফায়দা লোটে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা।

এই হাটের গরু ব্যবসায়ীদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে মঙ্গলবার অপহরণের গুজব ছড়িয়ে এই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হতে পারে বলে ধারণা করছে অনেকে। তাদের ধারণা, তদন্ত করলে বেরিয়ে আসবে আসল ঘটনা।

এ বিষয়ে পাবনা পুলিশ সুপার আলমগীর কবির জানান, ছেলে ধরা বা অপহরণকারী সন্দেহে তাদের পিটিয়ে হত্যা করা হলেও এর পিছনে অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে, যা অধিকতর তদন্ত করলে বেরিয়ে আসবে। অপহরণের গুজব ছড়িয়ে তাদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে কি না, সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে যারাই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকুক না কেন, তাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হবে।