Opu Hasnat

আজ ১৪ ডিসেম্বর শুক্রবার ২০১৮,

ব্রেকিং নিউজ

ভাটপাড়া গ্রামের ২ হাজার নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান

মহেশপুরে ৮’শ পরিবার বাউকুল চাষ করে সাবলম্বী কৃষি সংবাদঝিনাইদহ

মহেশপুরে ৮’শ পরিবার বাউকুল চাষ করে সাবলম্বী

ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার ভাটপাড়া গ্রামের ৮’শ পরিবার বাউকুল চাষ করে সাবলম্বী হয়েছেন। কুলচাষে গ্রামের প্রায় ২ হাজার নারী পুরুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। ওই গ্রাম থেকে প্রতিদিন ৩০ লাখ টাকার কুল বিক্রি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে কুলচাষীরা।  

সরেজমিন গিয়ে দেখাগেছে, মহেশপুর উপজেলার মান্দারবাড়িয়া ইউনিয়নের ভাটপাড়া গ্রামের মাঠে শত শত বিঘা জমিতে বাউকুলের চাষ করা হচ্ছে। গ্রাম থেকে বেরিয়ে তাকাতেই মাঠের যতদুর চোখ যায় শুধু কুলের বাগান ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়েনা। দেশের আবহাওয়া অনূকুলে থাকায় এবার বাউকুল ধরেছেও প্রচুর। বিগত বছরের তুলনায় এবার বাজারে দামও ভালো। গ্রামের মানুষ কেউ বা নিজের জমি আবার কেউবা অন্যের জমি লীজ বা বর্গা নিয়ে শুরু করেছেন বাউকুলের চাষ। এখন কুলের মৌসুম, তাই প্রতিদিন এখান থেকে ২/৩  ট্রাক কুল যাচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। ভাটপাড়া  গ্রামের ৯শ পরিবারের মধ্যে প্রায় ৮শ পরিবারই বাউকুল চাষ করেছে। গ্রামের প্রায় ৩ হাজার বিঘা জমির মধ্যে ২ হাজার ৪শ বিঘা জমিতে চাষ করা হয়েছে এই বাউকুল। প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার নারী পুরুষ কুলের বাগানে কাজ করে। বাগান থেকে কুল ছিড়ে বাজারজাত করণের জন্য প্যাকেজিংএর কাজে ব্যস্ত থাকে তারা।

গ্রামের ৯০ ভাগ মানুষই কুল চাষের সাথে জড়িত।  প্রতিদিন ৩০ লাখ টাকার কুল বিক্রি করা হচ্ছে বলে জানান কুলচাষীরা। কৃষি অফিসের সুত্র মতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাউ কুল চাষের গ্রাম ভাটপাড়া। ভাটপাড়া গ্রামটিকে কুলের গ্রাম হিসেবেই পরিচিত করে তুলেছে স্থানীয় গ্রাম বাসিরা। 

২০১১ সালের দিকে ভাটপাড়া গ্রামের স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক ও কৃষক ডাঃ তাজু উদ্দিন প্রথমে দেড় বিঘা জমিতে বাউকুলের চাষ শুরু করেন। ওই বছরে তিনি কুল বিক্রি করে ভালো টাকা আয় করেন। এর পর কুল চাষে তার আগ্রহ বেড়ে যায। পরের  বছর আরো ৪ বিঘা জমিতে তিনি বাউকুল চাষ করেন।  এর পর  ডাঃ তাজু উদ্দিনকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। তার দেখে গ্রামের মানুষের বাউকুল চাষে আগ্রহ বেড়ে যায়। এরপর তারা বাউকুল চাষ শুরু করেন। এখন ওই গ্রামে প্রায় ২ হাজার ৪শ বিঘা জমিতে কুল চাষ করা হচ্ছে। কুল চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছে অধিকাংশ চাষী। কেউ কিনেছেন জমি, মটরসাইকেল, কেউ বা তৈরি করেছেন পাকা বাড়ি।  গ্রামের এনামুল হকের ৬ বিঘা, তাজ উদ্দিন এর ৮ বিঘা, সোহরাব  উদ্দিনের ১৫ বিঘা, সবুজ উদ্দিনের ৮ বিভাগ, জিয়ার উদ্দিনের ৩ বিঘা, সিপনের ৬ বিঘা, মেহেদীর ৫ বিঘা, রশিদুল এর ৬ বিঘা, এপিয়ারের ৬ বিঘাসহ এই  গ্রামের প্রায় ৮শ পরিবারের কুলবাগান আছে। পরিচর্চার জন্য প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার নারী-পুরুষ কাজ করছে কুল বাগানে। 

প্রথম কুল চাষী ডাঃ তাজু উদ্দিন জানান, উপজেলা কৃষি অফিসের সহযোগিতায় প্রথম বছরে তিনি দেড় বিঘা জমিতে বাউকুল চাষ করেন। কুল চাষ একটি লাভজনক ফসল। কারো যদি এক বিঘা জমিতে কুল থাকে তাহলে সব খরচ বাদে ১ থেকে দেড় লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। এখন তার ৮ বিঘা জমিতে কুল আছে। তার দেখা দেখি এখন প্রায় ২ হাজার ৪শ বিঘা জমিতে বাউকুল চাষ হচ্ছে। তিনি বলেন বাউ কুল মুলত ৩-৪ মাসের ফসল। যে জমিতে কুল চাষ করা হয় সেই জমিতে বাড়তি ফসল হিসেবে বোরো ধান কিংবা কলাই চাষ করা যায়।

বাউকুল চাষী লিটন জানান, বর্তমানে প্রতি কেজি বাউকুল পাইকারী বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টাকা দরে। ঢাকার পাইকারী ব্যবসায়ীরা বাগান থেকেই কুল  ট্রাকে করে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, এক বিঘা জমি থেকে ৯০ থেকে ১০০ কাটুন কুল সংগ্রহ করা যায়। প্রতি কাটুনে ৭০ কেজি হিসেবে ৬ হাজার ৬শ থেকে ৭ হাজার কেজি বাউ কুল পাওয়া যায়। গড়ে ৩৫ টাকা দর হিসেবে এক বিঘা জমি থেকে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার টাকার বাউ কুল বিক্রি করা যায়। বাউকুল চাষী সবুজ জানান, এক বিঘা জমিতে বাউকুল চাষ করতে খরচ হয় মাত্র ৩০ থেকে ৪০ হাজার  টাকা।

মান্দারবাড়িয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শফিদুল ইসলাম জানান, তার ইউনিয়নের ভাটপাড়া গ্রাম বাউ কুল চাষের জন্য বিখ্যাত। প্রতিদিন ২থেকে ৩ ট্রাক বাউকুল এখান থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা চচ্ছে। বাউকুল চাষ করে অনেকে স্বাবলম্বী হয়েছে। চেয়ারম্যান আরো জানান, কুল চাষের সাথে প্রায় ১ হাজার নারী জড়িত। তারা কুলবাগানে শ্রম দিয়ে প্রতিদিন ১৫০ টাকা আয় করছে।

ঢাকার যাত্রাবাড়ির বাউকুল ব্যবসায়ী আব্দুর রহিম জানান, তিনি এই গ্রাম থেকে প্রতি বছর কৃষকদের কাছ থেকে বাউকুল ক্রয় করেন। এর পর এগুলো ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। তিনি বলেন, মহেশপুরের ভাটপাড়া গ্রামে উৎপাদিত বাউকুল খুর সুস্বাদু।

মহেশপুর উপজেলার কৃষি অফিসার আবু তালহা জানান, ২০১১ সালের দিকে উপজেলা কৃষি অফিসের দ্বিতীয় শস্য বহুমুখি প্রকল্প ( এসসিডিপি) আওতায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে ডাঃ তাজু উদ্দিন দেড় বিঘা জমিতে বাউকুল চাষ করেন।  বাউ কুল  লাভজনক ফসল। অল্প সময়ে এটি চাষ করে বেশি লাভ করা যায়। কুলের পাশাপাশি এই জমিতে বোরো ধান, কলাই চাষ করা যায়। বাউকুল চাষীদের কৃষি অফিস থেকে সার্বিক সহযোগিতা করা হচ্ছে। কারিগরি, রোগবালাই, কৃষক প্রশিক্ষণ, কুল প্যাকেজিংসহ সার্বিক সহযোগিতা করা হচ্ছে। বাউ কুল চাষীদের সার্বিক সহযোগিতার জন্য শামিম খান নামের একজন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মান্দারবাড়িয়া ব্লকে রাখা হয়েছে।