Opu Hasnat

আজ ২৬ সেপ্টেম্বর বুধবার ২০১৮,

ব্রেকিং নিউজ

‘কিডনি রোগ এবং নারী’ বিষয়ক গোল টেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত স্বাস্থ্যসেবা

‘কিডনি রোগ এবং নারী’ বিষয়ক গোল টেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত

‘‘কিডনি রোগে তুলনামূলকভাবে পুরুষদের চেয়ে নারীরাই বেশী আক্রান্ত হয় এবং বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে কিডনি চিকিৎসার ক্ষেত্রে নারীরা পিছিয়ে পড়া এবং অবহেলিত,’’ শনিবার এক গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা এ মন্তব্য করেন।

“বিশ্বব্যাপী কিডনি রোগ একটি ভয়বহ স্বাস্থ্য সমস্যা, প্রতিবছর বিশ্বের প্রায় ৬ লক্ষ নারী অকাল মৃত্যুবরণ করে কিডনি বিকল হয়ে। সারা বিশ্বে ১৪ শতাংশ নারী পক্ষান্তরে ১২ শতাংশ পুরুষ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত, অথচ চিকিৎসা গ্রহনের সুযোগ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নারীরা অবহেলিত, তারা পুরুষ শাষিত সমাজে বৈষম্যের শিকার ” বক্তারা বলেন।

‘‘বিশ্ব কিডনি দিবস ২০১৮’’ উদযাপন উপলক্ষ্যে আয়োজীত কর্মসূচীর অংশ হিসেবে দেশের শীর্ষস্থানীয় কিডনি বিষয়ক বেসরকারী স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, কিডনি এওয়ারনেস মনিটরিং এন্ড প্রিভেনশন সোসাইট (ক্যাম্পস), ০৩ মার্চ (শনিবার) ডেইলি ষ্টার সেন্টার, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, এ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে।

প্যানেল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাঃ মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, সভাপতি, বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন, অধ্যাপক ডাঃ হারুন অর রশিদ, চেয়াম্যান, কিডনি ফাউন্ডেশন, অধ্যাপক ডাঃ রফিকুল আলম, সভাপতি, বাংলাদেশ রেনাল এসোসিয়েশন, অধ্যাপক ডাঃ এম এ সালাম, প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ইউরোলজি, আব্দুল কাইয়ুম, সহযোগী সম্পাদক, প্রথম আলো, ফেরদৌস আহমেদ, চলচ্চিত্র অভিনেতা ও মডেল প্রমুখ।

ক্যাম্পস এর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি এবং ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল এর কিডনি বিভাগের চীফ কনসালটেন্ট, অধ্যাপক ডাঃ এম এ সামাদ এ গোলটেবিল বৈঠকের সঞ্চালন করেন এবং তিনি কিডনি রোগ এর প্রতিরোধ, প্রতিকার এবং কিডনি রোগ চিকিৎসায় মহিলাদের ক্ষেত্রে বৈষম্য দূরিকরনের উপায় নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

বিএমএ এর সভাপতি, সাবেক সংসদ সদস্য ডাঃ মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বলেন, দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শীর্ষ পদ গুলোতে এখন নারীর উপস্থিতি অনেক বেশী। আমি দেখেছি এমবিবিএস এ ভর্তির ক্ষেত্রেও এখন মেয়ে প্রর্থীর সংখ্যা তুলনা ভাবে অনেক বেশী তাই বোঝা যাচ্ছে যে, পিছিয়ে পড়া নারীর অপবাদ ঘুচাতে এখন আমরা অগ্রসর হচ্ছি।

তিনি বলেন, আমাদের মেধা, বুদ্ধি ও তারুন্য আছে যা কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যেতে পারব। তবে নারীর অগ্রাধীকার নিশ্চিত করতে সর্ব মহল থেকে সাহায্য করতে হবে। নারীর যে তীক্ষ বুদ্ধি নিবীড় কর্মক্ষমতা রয়েছে তা কাজে লাগাতে হবে।

তবে একথা স্বীকার করতে হবে যে দেশের নারীর ভূমিকা, ক্ষমতায়ন, সিদ্ধান্ত গ্রহনে অবদান রাখতে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত আগ্রহী এবং কর্মতৎপর ডাঃ জালাল বলেন।

কিডনি ফাউন্ডেশন এর চেয়াম্যান অধ্যাপক ডাঃ হারুন অর রশিদ বলেন, দেশে ব্যাপক সংখ্যক কিডনি রোগীর তুলনায় ডায়ালাইসিস সেন্টার খুবই কম, মাত্র ৯৬ টি, এবং ১৮০০০ হাজার রোগী এসব সেন্টারে সপ্তাহে ২ বার করে ডায়ালাইসিস পায়। বেসরকারী সেন্টার গুলোতে ৩৫০০ থেকে ৫০০০ টাকা পর্যন্ত পর্যন্ত ডায়ালাইসিস মূল্য রাখা হয় যা নি¤œবিত্ত এমনকি মধ্যবিত্তের জন্য বহন করা অসম্ভব। 

তিনি বলেন, সাইথ এশিয়াতে মোট কিডনি রোগীর তুলনায় মাত্র ১৫ শতাংশ রোগী ডায়ালাইসিস এর সুযোগ পায় বাকী বিশাল সংখ্যক রোগী অর্থাভাবে ডায়ালাইসিস নিতে পারে না। তাই বাংলাদেশে ডায়ালাইসিস খরচ কমাতে সরকারী বেসরকারী ভাবে বাস্তবিক উদ্যোগ নিতে হবে।   

নারীদের কিডনি চিকিৎসায় বৈষম্য দুরীকরনে স্বয়ং সরকারকে বিশেষ ভূমিকা রাখার আহবান জানিয়ে ডাঃ হারুন অর রশি বলেন, এ বিষয় সমাজে মানুষের একটি মাইন্ড-সেট আছে যা পরিবর্তন হওয়া খুবই জরুরী।

চলচ্চিত্র অভিনেতা ফেরদৌস আহমেদ বলেন, মানুষ এবং মানবতার প্রতি বোধেড় পরিবর্তন সর্বগ্রে জরুরী। সমাজে নারির বিষয়ে সুস্থ চিন্তাধারার অভাব রয়েছে বলে উল্ল্যেখ করে তিনি বলেন যদি সৃষ্টিশীর চেতনা এবং প্রবনতা থাকে তাহলে বড় সমস্যারও ছোট উদ্যোগের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব।

তিনি কিডনি বিষয়ে এবং নারীর স্বাস্থ্য সচেতনতা তৈরী করতে বিষয় ভিত্তিক নাটক, এমনকি সিনেমাও তৈরি করে হলেও বার্তা গুলো পৌছাতে হবে।

ফেরদৌস গণ সচেতনতা বৃদ্ধিতে ক্যাম্পস এর ব্যাপক  ভূমিকা এবং কর্মকান্ডের প্রসংসা করে সমাজের বিত্তবান লোকদের এ ধরণের কাজে পৃষ্ঠপোষনের আহবান জানান।

মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক ডাঃ এম এ সামাদ বলেন, নারীরা এদেশে সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রায় সবক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া কিংবা অবহেলার শিকার, সে ক্ষেত্রে অনুৎপাদন শীলতা, গুরুত্বহীনতা, জড়তা, লোকলজ্জা, সহজাত লুকিয়ে রাখার প্রবণতা এসব কারণের জন্য বিশেষ করে চিকিৎসা সেবা গ্রহনের বা প্রদানের ক্ষেত্রে নারী এখনো সিমাহীন বৈষম্যের শিকার। এ চিত্র বাংলাদেশে যেমন প্রকট, বহির্বিশ্বে বা বিশ্বজুড়ে ধনী দারিদ্র নির্বিশেষে বিভিন্ন দেশে ও চিকিৎসা সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে নারীর প্রতি অবহেলা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। 
এ বিষয়টি মাথায় রেখে বিশ্ব কিডনি দিবস উদযাপন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক “বিশ্ব কিডনি দিবস ২০১৮” এর প্রতিপাদ্য হিসেবে “কিডনি এ্যান্ড উইমেন হেলথ : ইনকুড, ভ্যালু, এমপাওয়ার” নির্ধারণ করা হয়েছে। কিডনির সাথে নারীর স্বাস্থ্য নিবীরভাবে জড়িত। সুস্বাস্থ্যের জন্য নারীদের অংশগ্রহন, মূল্যায়ন ও ক্ষমতায়ন জরুরী। সমগ্র বিশ্ব প্রেক্ষাপটে নির্ধারন করা হলেও দেখা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি অতিমাত্রায় প্রযোজ্য, সময়োপযোগী এবং তাৎপর্যপূর্ণ একটি বিষয়বস্তু যে দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশী নারী সে দেশের নারীদের অবহেলা করে কিংবা গুরুত্বহীন রেখে আর্থসামাজিক উন্নয়ন কোনভাবেই সম্ভব নয়।

ডাঃ এম এ সামাদ বলেন, পৃথিবী ব্যাপি কিডনি রোগের প্রবৃদ্ধি অত্যন্ত ব্যাপক। বাংলাদেশে প্রায় ২ কোটি লোক কোন না কোন কিডনি রোগে আক্রান্ত। কিডনি বিকলের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয় বহুল বিধায় এদেশের শতকরা ১০ জন রোগী এ চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারে না। অর্থাভাবে চিকিৎসাহীন থেকে অকালে প্রাণ হারান সিংহভাগ রোগী। পক্ষান্তরে, একটু সচেতন হলে ৫০ থেকে ৬০ ভাগ ক্ষেত্রে কিডনি বিকল প্রতিরোধ করা সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন প্রাথমিক অবস্থায় কিডনি রোগের উপস্থিতি ও এর কারণ শনাক্ত করে তার চিকিৎসা করা। 

এ গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা অভিমত ব্যাক্ত করেন যে, চিকিৎসা করে নয় বরং প্রতিরোধ করেই এ রোগের প্রাদূর্ভাব প্রশমন করতে হবে আর এ জন্য সচেতনতাই একমাত্র উপায়।
আলোচক বৃন্দের মধ্যে আরো ছিলেন অধ্যাপক (মেজর অবসর) ডাঃ লায়লা আনঞ্জুমান বানু, পেসিডেন্ট, অবাস্ট্যাট্রিক্যাল এন্ড গাইনোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ, মিতা হক, বিশিষ্ট রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী, গোলাম রহমান, চেয়ারম্যান, কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, ফারজানা ব্রাউনিয়া, চেয়ারম্যান ও সিইও, স্বর্ণ কিশোর নেটওয়ার্ক ফাউন্ডেশন, ফরিদা ইয়াসমিন, জেনারেল সেক্রেটারী, জাতীয় প্রেসক্লাব, গাজী আশরাফ হোসেন লিপু, সাবেক অধিনায়ক, বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট টিম, নিরব হোসেন, অভিনেতা ও মডেল প্রমুখ। 

এ ছাড়াও গোল টেবিল বৈঠকে দেশের সরকারী পর্যায়ের নীতি নির্ধারক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, শিল্পী, শিক্ষাবিদ, ক্রীড়াবিদসহ বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।