Opu Hasnat

আজ ১৬ জুলাই সোমবার ২০১৮,

মুন্সীগঞ্জের পাতক্ষীর যেন- ‘দিল্লিকা লাড্ডু’! লাইফ স্টাইলমুন্সিগঞ্জ

মুন্সীগঞ্জের পাতক্ষীর যেন- ‘দিল্লিকা লাড্ডু’!

প্রচলিত আছে ‘দিল্লি কা লাড্ডু - যে খেয়েছে সে, যে খাইনি সেও পস্তায়’। তেমনি মুন্সীগঞ্জ তথা বিক্রমপুরের- ‘পাতক্ষির’ এর স্বাদ যারা একবার নিয়েছেন সেই স্বাদ আবারও নিতে তাদের সবারই জিভে পানি ঝরবে। যেমনটি টক-তেতুলের কথা শুনলেই যে কারোরই জিভে পানি ঝড়ে পড়তে খাকে।

ঐতিহ্যবাহী নানা উৎসবে এ ক্ষিরের উপস্থিতি না থাকলে যেন অসম্পূর্ন থাকে সে উৎসব। একমাত্র মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামেই তৈরি হয় বিশেষ এই মুখরোচক খাবার। শুধু গাভীর দুধ দিয়ে তৈরি এ সু-স্বাদু ‘পাতক্ষির’ এর চাহিদা এখন সুদূর ইউরোপেও জনপ্রিয়তা পেয়েছে। 

শতাব্দীর প্রসিদ্ধ এই খাবারের জনপ্রিয়তাও বাড়ছে অন্যান্য দেশ-বিদেশেও। সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, প্রতিদিন কয়েক মন দুধ ব্যবহার হচ্ছে এ পাত-ক্ষির তৈরিতে। সব মৌসুমেই এর চাহিদা থাকলেও শীতে এর চাহিদা অনেক বেশী। বাঙালী ঐতিহ্যের পাটিসাপটা পিঠা তৈরিতেও প্রয়োজন হয় এ পাতক্ষিরের। 

নতুন জামাইর সামনে পিঠাপুলির সাথে এই এ ক্ষির ব্যবহার না করা যেন বেমানান হয়ে উঠে। গ্রাম-বাংলায় মুরির সঙ্গেও এ ক্ষির খাওয়ার পুরানো রীতি রয়েছে।

মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার সন্তোষ গ্রামের সাতটি পরিবার এখন এই ক্ষির তৈরীর সাথে জড়িত।

তবে পুলিনবিহারী দেবই প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে এ ক্ষির তৈরী করে বিক্রি করতেন বলে তার উত্তরসূরিরা জানান। সেও শতাধিক বছর আগের কথা। এছাড়া ইন্দ্র মোহন ঘোষ, লক্ষী রানী ঘোষও তৈরি করতেন এই ক্ষির। তারা সকলেই বর্তমানে প্রয়াত। এখন তাদের বংশধররাই এই পেশা ধরে রেখেছেন। বর্তমানে এ পেশায় রয়েছেন,-কার্তিক চন্দ্র ঘোষ, ভারতী ঘোষ, সুনীল চন্দ্র ঘোষ, রমেশ শ্যাম ঘোষ, বিনয় ঘোষ, মদুসূদন ঘোষ, সমির ঘোষ ও ধনা ঘোষ। তবে সুনীল ঘোষের পরিবারের ৫ ভাই এ পেশায়। 

তবে এ পাত-ক্ষির তৈরীতে বেশি পারদর্শী পারুল ঘোষ বলেন, প্রতিটি পাতক্ষির তৈরীতে ৩ কেজি দুধ প্রয়োজন হয়। আধা ঘন্টার বেশী সময় ধরে জাল দিতে হয় এ দুধ। দুধের সঙ্গে সামান্য প্রায় ৫০ গ্রাম চিনি ব্যবহার করা ছাড়া আর কিছুই ব্যবহার হয় না এ ক্ষির তৈরীতে। 

তবে ডায়াবেটিক রোগীর জন্য বিশেষ অর্ডার থাকলে এ চিনি দেয়া হয়না। তারপর যখন দুধ ঘন হয়, তখন মাটির তৈরি পাতিলের মতো বিশেষ পাতিলে রাখা হয় এ ক্ষির। প্রায় ১ ঘন্টা পর ঠান্ডা হলে তা কলা পাতায় পেচিয়ে বিক্রয়যোগ্য করা হয়। তবে হাতের যশ ও কৌশল ক্ষির তৈরীতে কাজে লাগাতে হয়। ঘন করতে গেলে চুলোয় দুধে পোড়া লেগে যায়। তাই কাঠের বিশেষ লাঠি দিয়ে নাড়তে হয় দুধ অনবরত।

আর ‘পাতা’ নিয়েই এর নামকরন। হ্যাঁ, ক্ষির তৈরী সম্পন্ন হওয়ার পর এ ক্ষির কলা পাতায় জড়িয়ে থাকে বলেই এ ক্ষিরের নাম হয়েছে পাতক্ষির। শুধু সুনীল ঘোষের বাড়িতেই প্রতিদিন এ ক্ষীর তৈরী হয় ৫০ টিরও বেশী। 

প্রতিটি ক্ষিরের ওজন প্রায় আধা কেজি। প্রতি পাতক্ষিরের মূল্য ১০০ থেকে ১শ ৫০টাকা। 
বর্তমানে বাজারে দুধের দাম বেড়ে গেলে বেড়ে যায় ক্ষিরের দামও। ঘরের বউরা এ ক্ষির তৈরিতে কষ্ট করেন সবচাইতে বেশি।

হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রমের পর তৈরী হয় এ ক্ষির। তবে প্রতিটিতে ১০ থেকে ২০ টাকার বেশী লাভ হয়না। 

দোকানে নিয়ে বিক্রি ছাড়াও মুন্সীগঞ্জসহ রাজধানী ঢাকাবাসীরা বাড়িতে এসেও অর্ডার দিয়ে পাত-ক্ষির কিনে নিয়ে যায়।

এদিকে, পাত-ক্ষির কারিগর নয়নতারা ঘোষ বলেন, আমেরিকা, ইতালী, জার্মান, ফ্রান্স ও জাপান থেকেও এ ক্ষিরের অর্ডার আসে। 

আমাদের হাতে তৈরী এ খাবারের বিনিময়ে বৈদেশিক মুদ্রাা অর্জিত হয় এটাইতো মুন্সীগঞ্জ জেলাবাসীর বড় প্রাপ্তি। পারুল ঘোষ বলেন, আমরা কষ্ট করে এ ক্ষির তৈরি করলেও আমাদের মেয়েদের তা শিখাইনা। 

কারণ তারা বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, কলেজে পড়ে। তবে এ বাড়ির বৌ হিসাবে যারা আসেন তাদেরই এ কাজ করতে হয়।

এই পাত-ক্ষির মুন্সীগঞ্জ তথা বিক্রমপুরের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে যুগ যুগ ধরে। 

এছাড়া বিক্রমপুরের দই, মিষ্টি, বিশেষ করে ছানার আমিত্তিও বেশ জনপ্রিয়। আর সুস্বাধু রসমসলাইতো রয়েছেই। 

কিন্তু সব কিছুকে পেচনে ফেলে পাতক্ষিরের ঐতিহ্য আর ব্যাতিক্রমের দিক থেকে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশে একটি জায়গা দখল করে আছে শত-শত বছর ধরে। 

তবে সরকারী পৃষ্টপোষকতা পেলে ঐতিহ্য বহনকারী পাত-ক্ষির তৈরিতে আরো উৎসাহ-ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারবে বলে এখানকার পাত-ক্ষির কারিগরেরা মনে করেন এবং এর সাথে-সাথে আগামীতেও এর ধারা অব্যাহত রাখতে পারবেন বলে আশাবাদী মুন্সীগঞ্জসহ গোটা বাংলাদেশ।