Opu Hasnat

আজ ২৫ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার ২০১৮,

ব্রেকিং নিউজ

‘সিদ্ধির সাথে প্রবৃদ্ধি নিয়ে গঞ্জিকা সেবনের কথকতায় বাউল তথ্য’ মতামত

‘সিদ্ধির সাথে প্রবৃদ্ধি নিয়ে গঞ্জিকা সেবনের কথকতায় বাউল তথ্য’

গাঁজা খোর কথাটা শুনতে খারাপ শোনায়। এমন কি গালাগালি কিংবা নেতিবাচক অর্থেও এর ব্যবহারের ব্যাপকতা রয়েছে। যদিও গাঁজা একটি ভেষজ উপাদানের সবুজ বৃক্ষ বলা যায়। যার গুনাগুণ অতুলনীয়। তবু তার নির্গুণকে উপলক্ষ্য করেই কতিপয়ের অপব্যবহার, অপপ্রচারে বন্ধ হয়ে গেছে আইন করে। অথচ এই গাঁজার প্রকৃত নাম হল সিদ্ধি, যাহা সাধু-সন্তদের কথায় পাওয়া যায়- ‘সিদ্ধ পুরুষ মাত্রই সিদ্ধির খোরাক অত্যাবশ্যক’। তাই বাউল ফকিরা বলেছে যে, প্রকৃতির অপারলীলায় গঞ্জিকা বৃক্ষের জন্ম হয় সেই মাটিতে, যেখানে সিদ্ধ পুরুষ এসে আশ্রয় নেবে তার অনন্ত ক্ষুধা নিবৃত্তির খোরাকিতে। যে বা যারা প্রকৃতির এই বৃক্ষ নিধন করে পাহারায় রাখে, তারাতো প্রকৃতির সাথেই বিরোধীতা করল আর সাধু সন্তদের খোরাক তুলে দিল। তাইতো দিল-কলিজ্বায় আঘাত পেয়ে সাধু –সন্তরা স্থান পরিবর্তন করে আর দেশান্তরিত হয়ে বিদেশ বিভুঁইয়ে চলে যায়। এক সাধুতো বলেই ফেললো-‘একতারা হাতে মাটির গান গাইতে গাইতে নিজের বাপ-দাদার ভিটে বছরে একবার দেখতে আসি ঠিকই কিন্তু নিজের খোরাক নাই বলে ফিরে যেতে হয় অন্যত্র। এখানে সাধু-সন্ত তাদের খোরাক পায় না বলেই সাধারণের খোরাকে আগুন লেগেছে। বাজার দরে দ্রব্যমূল্য সবাইকে যাতনায় রাখছে। এ বড় অভিশাপ, সহজে থামবে না। এরপরও কি গঞ্জিকা সেবন বন্ধ হয়ে যাবে ? এ কথায় বাউল সাধুর উত্তর হল ‘একমাত্র গঞ্জিকা সেবনেই বায়ু শুদ্ধ আর সুরের মায়া তৈরী হয়। এই মায়াতেই পৃথিবী টিকে আছে। যদি সাধু-সন্তরা দেশ ছেড়ে চলে যায় তাহলে সেখানে বিপর্যয় বাসা বাঁধে। তাইতো সাধু-সন্তরা দলে দলে এদেশে প্রতি বছর তাদের নানা আস্তানায় জড়ো হয়ে গঞ্জিকা সেবন করে সিদ্ধি প্রাপ্তির আলো আর মায়া ছড়িয়ে যায়।

আমরা দেখেছি বিশেষ করে উত্তর জনপদের বগুড়ার মহাস্থান গড়ে, সোলেমান শাহ’র পদ্মা বিধৌত অঞ্চলে, কুষ্টিয়া ভেড়ামারার লালন শাহ, ঘোড়াশাহ’র মাজার প্রাঙ্গনে ব্যাপক গঞ্জিকা সেবী সাধু সন্ত বাউলের দর্শনীয় পদচারণা। এরা চায় না কোন বিত্ত-বৈভব আর জীবন জীবিকার প্রাচুর্য্য। ইহজাগতিক মোহমায়ায় তারা মহাবিষ্ঠ নয়। তাই সিদ্ধি লাভ করে যোগ মায়ায় বিলুপ্ত হতে থাকে। বিধির অপার লীলায় লয় হতে হলে যে সুরের মায়া লাগে তার সুতো নাকি সিদ্ধির সাথে বাঁধা আছে। সে কারণেই হয়তো অনেক শিল্পী, সাধক, গায়ক, মাধব, মোহন্ত, শিক্ষক এমনকি ধ্যানতঃ অধ্যাবসায়ী ছাত্রও একাগ্র চিত্তের সাধনায় সিদ্ধির আশ্রয়ে লালিত হয়ে থাকে বলে অতিগোপন সূত্রের তথ্যমূলে জানা যায়।

কেন না, শ্রদ্ধার সাথে সিদ্ধির সঙ্গ নাকি বড়ই উপাদেয়। আমাদের নওগাঁ অঞ্চলে এর চাষ হলে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় হত আর চাষীও সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারতো। সেই গাঁজার চাষ বন্ধ হয়েছে ঠিকই কিন্তু গঞ্জিকা সেবন বন্ধ হয় নাই। তাই বলতে হয় “অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ হয়” সে তো প্রাকৃতিক এবং তার সাথে আবার অতিপ্রাকৃত রূপের সমাহার স্বরূপে বেষ্টিত। তা না হলে কুমার পালেরা যত্ন করে গঞ্জিকা সেবনের জন্য মোহন বাঁশির মত করে ‘কল্কে’ নির্মাণ করতো না। মৃৎ শিল্পের এক বিশেষ উপাদান হিসেবে শিল্পরূপে গঞ্জিকা সেবনের কল্কে দেখা যায় নানা আকৃতির। এর সাথে গঞ্জিকা কর্তনের জন্য যে কাঠের টুকরা ব্যবহার করা হয় তার নাম প্রেমতক্তি এবং যে অস্ত্র দ্বারা গঞ্জিকা কর্তন করা হয় তার নাম প্রেমকাটারী। বড়ই মায়াবী মাধুর্যে গঞ্জিকা সেবনের সরঞ্জামকে স্মরণকরা হয়। এমনকি শিব দেবতার প্রসন্ন প্রশস্তি গাঁথার উপাখ্যানে সিদ্ধির সাথে কল্কের বিচিত্রতা নাকি ভিন্ন রকমের। তান্ত্রিক সাহিত্যে সিদ্ধির গোপন সূত্রতা আছে বলে কবি সাহিত্যিক শিল্পী সহ বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরেও এর সাধন মার্গের চড়াই উৎরাই নিয়ে বিশেষ চর্চা চালু আছে,অতিব সন্তর্পনে নিরবে নিভৃতিতে। আবার আমাদের গ্রাম বাংলায় দেখা যায় যে, গৃহ লক্ষি গো-ছাগলের গলায় বহু ব্যবহৃত পুরাতন কল্কি ঝুলিয়ে নিশ্চিন্ত হন কারণ, এই কল্কের কৃপায় সিদ্ধ পুরুষের নজর থাকে বলে কোন অপশক্তিই তার আর কোন ক্ষতি করতে পারে না। বিধায় গৃহস্থের আয়-উন্নয়ন বাড়ে। যার আঙ্গিক নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অনেক লেখক তাদের ভিন্ন ভিন্নরূপে বর্ণনা দিয়েছেন। যেমন-শরৎ সাহিত্যে শ্রীকান্তের সেই ইন্দ্রনাথকে দিয়ে লেখক রীতিমত চাঞ্চল্য তৈরী করেছেন গঞ্জিকা সেবনের রূপ বর্ণনায়। আবার মঠ বা আশ্রমে যে সমস্ত গৃহ ত্যাগী বা যোগী সাধুদের পদচারণা আছে তাদের প্রকৃত রূপ বর্ণনা করতে গেলে গঞ্জিকা সেবনের সাথে দুগ্ধ যে কতটা গুণবাচক ভূমিকা রাখে সে সর্ম্পকে আলোকপাত নাই বা করলাম। তবে সে যাই হোক যোগ উপযোগ মিলিয়ে গঞ্জিকা যে এক যুগান্তকারী ভেষজ উপাদানের মাহাত্মে ঠাঁই করে নিয়েছে স্বর্ণ আসনে তা অনস্বীকার্য। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো ভদ্র বেশে সাধারণের ভেতর অনেককেই সিগারেটের মত গাঁজার স্টিক টানতে দেখা যায় চিত্তের প্রবৃদ্ধি সাধনের প্রত্যাশায়। আবার তখনি মনে হয় সেই বিশিষ্ট শিল্পী কিশোর কুমারের গান “একটানেতে যেমন তেমন-দুটানেতেৃৃ. রাজা।

লেখক পরিচিতি
হাসান আহমেদ চিশতী
প্রবন্ধকার ও উপন্যাসিক, কলাম লেখক