Opu Hasnat

আজ ২৩ অক্টোবর বুধবার ২০১৯,

আলুটিলা সড়ক দুর্ঘটনায় মহালছড়ির ৬জনের মৃত্যুতে শোকের ছায়া খাগড়াছড়ি

আলুটিলা সড়ক দুর্ঘটনায় মহালছড়ির ৬জনের মৃত্যুতে শোকের ছায়া

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার মাটিরাঙা উপজেলার আলুটিলা এলাকায় ট্রাক চাপায় নিহত ৮জনের মধ্যে ৬জনের বাড়িই মহালছড়ির চৌংড়াছড়ি গ্রামে। স্বজন হারানোর বেদনায় এখন ওই এলাকায় শোকের মাতম। স্বজনদের আর্তনাদে ভারী হয়ে আছে চৌংড়াছড়ির বাতাস। এর আগে একসাথে এতো মানুষ বিদায় দেয়নি মারমা অধ্যূষিত চৌংড়াছড়ি গ্রামবাসী। শনিবার বিকেলে ধর্মীয় রীতিমতে নিহতদের সম্মিলিত মহাশ্মশানে অন্তোষ্টিক্রিয়া দাহ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। দাহ ক্রিয়া অনুষ্ঠানে আগত অতিথি ও আত্মীয স্বজনদের আগামী ৬জানুয়ারী(সোমবার) সাদ্ধ্যক্রিয়া(সাপ্তাহিক) ও মংগলসূত্র পাঠদান করা হবে বলে জানিয়েছেন ৬জনের নিহত পক্ষে অত্র এলাকার চৌংড়াছড়ি পাড়ার প্রধান/কার্বারী সুইচিং মারমা। ৪জন নিহত শোকাহত পরিবারে প্রতি সদগতি ও মংগল কামনায় স›দ্ধ্যায় শাপলা চত্বর এলাকায় সাধারন জনগনের পক্ষে লাইনে দাড়িয়ে মোমবাতি প্রজজ্জলন করা হয়।

শনিবার সকালে চৌংড়াছড়ি গ্রামে গিয়ে নিহত ও আহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ(পাজেপ) চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী, পাজেপ সদস্য জুয়েল চাকমা, মহালছড়ি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান রতন শীল। 

নিহত ৬জনের মংগলার্থে বিকেলে অন্তেষ্টিক্রিয়া দাহক্রিয়ায় চৌংড়াচড়ি মহাশ^শানে পঞ্চমশীল প্রদান করেন চৌংড়াছড়ি জেতবন বিহারে অধ্যক্ষ ওয়ারাসামি মহাস্থবির, মহালছড়ি আর্যমিত্র বৌদ্ধ বিহারে অধ্যক্ষ ইন্ডাছাড়া মহাস্থবির, তবলছড়ি ডাকবাংলো বৌদ্ধ বিহারে অধ্যক্ষ শুদেংমা স্থবির, হাপমারা নতুন বৌদ্ধ বিহারে অধ্যক্ষ গুংধলা স্থবিরসহ অন্যান্য ভিক্ষুক সংঘরা। ধর্মদেশনা প্রার্থনায় অংশ গ্রহন করেন আলুটিলা নবগ্রহ ধাতু চৈত্য বৌদ্ধ বিহারে ধর্মীয় গুরু প্রয়াত ভদন্ত চন্দ্রমণি মহাস্থবিরের অন্তেষ্টিক্রিয়া পরিচালনা কমিটি আহবায়ক ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রাক্তন চেয়ারম্যান চাইথোঅং মারমা, সদস্য সচিব উষা মারমা, পানছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান সর্বোত্তম চাকমা, খাগড়াছড়ি রিপোটার্স ইউনিটির সভাপতি চাইথোয়াই মারমা, মহালছড়ি উপজেলা সাবেক চেয়ারম্যান সোনারতন চাকমা, নারী নেত্রী এডভোকেট সমারী চাকমা, সাংবাদিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি প্রদীপ চৌধুরীসহ অন্যান্যের বিভিন্ন এলাকার লোকজন উপস্থিত ছিলেন। 

নিহতদের অন্তেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করতে জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ১৫হাজার টাকা করে নিহতদের স্বজনদের হাতে তুলে দেন চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী। এছাড়া আহতদের চিকিৎসার জন্য সহায়তা করার আশ্বাস দেন। খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসকের পক্ষে নিহত প্রতি পরিবারে ২০হাজার টাকা দেওয়ার ঘোষনা দেন মহালছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। এলাকার কার্বারী হাতে দাহক্রিয়া সম্পন্ন করা লক্ষে ২০হাজার টাকা এলাকালীন অনুদান স্বরুপ প্রয়াত ভদন্ত চন্দ্রমণি মহাস্থবিরের অন্তেষ্টিক্রিয়া পরিচালনা কমিটি আহবায়ক ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রাক্তন চেয়ারম্যান চাইথোঅং মারমা।

ঘটনার বিবরনে জানা যায়, খাগড়াছড়ির আলুটিলা ধাতুচৈত্য বৌদ্ধ বিহারে প্রয়াত চন্দ্র মনি মহাস্থবির এর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ধর্মীয় অনুষ্ঠানে গিয়ে গাড়ি চাপায় ঘটনাস্থলে মহালছড়ি উপজেলার চৌংড়াছড়ি গ্রামের একি পরিবারের ৩জন ও  শিশুসহ ৫ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। পরে আরো গুরুতর অবস্থায় আহত ববি মারমা(১৩) নামের একজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়। এ নিয়ে একই গ্রাম থেকে ৬জনের মৃত্যু ঘটে। যাঁদের মৃত্যু হয়েছে তাঁরা হলেন, মং মারমার ছেলে ও এবারের এস,এস,সি পরীক্ষার্থী উচিনু মারমা(১৭),  মংক্র মারমার ছেলে ও এসএসসি পরীক্ষার্থী অংক্যচিং মারমা (১৭), চাইলাগ্য মারমার স্ত্রী নেইম্রু মারমা, চাইলাগ্য মারমার বড় মেয়ে ও এবারের অস্টম শ্রেণীর ছাত্রী ববি মারমা(১৩), চাইলাগ্য মারমার ছোট মেয়ে এবারের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী নুনু মারমা (০৬),  মমং মারমার মেয়ে প্রথম শ্রেণির ছাত্রী মাটিং মারমা (০৬) । 

এ মর্মান্তিক ঘটনায় চৌংড়াছড়ি গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একসাথে স্ত্রী ও দুই কন্যা সন্তানকে হারিয়ে চাইলাগ্য মারমা বার বার মুর্ছা যাচ্ছিলেন।  বিকেল সাড়ে ৪টায় খাগড়াছড়ির সদর হাসপাতাল থেকে লাশের ময়না তদন্ত শেষে গ্রামে লাশের গাড়ি আসার সাথে সাথে আত্মীয় স্বজনের বুকফাটানো আহাজাড়িতে পুরো গ্রামের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। বিভিন্ন এলাকা থেকে দেখতে আসা শত শত আত্মীয় স্বজন ছাড়াও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকজন লাশ দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারছেনা কেউ। 

মর্মান্তিক এ ঘটনায় নিহত পরিবারকে শান্তনা দিতে এসে মহালছড়ি উপজেলা আওয়ামীলীগ এর সাধারণ সম্পাদক ও মহালছড়ি সদর ইউপি চেয়ারম্যান রতন কুমার শীল শান্তনা দেওয়ার ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি নিজেও চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। মহালছড়ি উপজেলা ভাইস-চেয়ারম্যান ক্যাচিংমিং চৌধুরী বলেন, পরিবারের সাথে আলোচনা করে লাশ গুলি একসাথে সামাজিক মহাশ্বশানে একত্রে দাফনের ব্যবস্থা সম্পন্ন করা হয়।

এদিকে জেলার মাটিরাঙা উপজেলার আলুটিলা পর্যটন এলাকায় ট্রাক চাপায় নিহত ৮জন ও ৭ জন আহত হওয়ার ঘটনায় মাটিরাঙা থানায় চালক মো: পলাশ ও সহকারী মো: সুমনকে আসামী করে পুলিশ মামলা করা হয়েছে। আটক সহকারী মো: সুমনের(১৭) স্বীকারোক্তি ও তথ্যের ভিত্তিতে চালক পলাশকে আটকের অভিযান চলছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার মো: মজিদ আলী। শুক্রবার সন্ধ্যায় খাগড়াছড়ি সদর থানায় সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় করে তিনি বলেন, প্রাথমিক তদন্তে এটি দুর্ঘটনা বলে প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু দুর্ঘটনার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্বার্থান্বেষী একটি মহল ঘটনাটি অন্যদিকে প্রভাবিত করতে অপপ্রচার করছে। যা সুষ্ঠু তদন্তে বেঘাত সৃষ্টি করতে পারে। আটক সহকারী মো: সুমনের বাড়ি দীঘিনালা উপজেলার ছোট মেরুং এলাকায়। তাঁর পারিবারিক বৃত্তান্ত যাচাই বাছাই করছে পুলিশ। অপরদিকে চালক পলাশকে আটকে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।

আটক সহকারী সুমন জানান, বৃহস্পতিবার রাতে কুমিল্লার দাাউদকান্দি থেকে পাথর নিয়ে খাগড়াছড়ি আসতেছিল তারা। সকাল ৮টার দিকে জালিয়াপাড়া এসে চালক পলাশ তাকে গাড়ী দিয়ে নেমে যায়। খাগড়াছড়ি আসার পথে আলুটিলা এলাকায় একটি চেয়ারকোচকে সাইট দিতে গিয়ে সে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। 

উল্লেখ্য, শুক্রবার বেলা ১১টায় আলুটিলা এলাকায় ট্রাক চাপায় ৮জন নিহত ও ৭জন আহত হয়। একটি পাথর বোঝাই একটি ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাগড়াছড়ির আলুটিলাস্থ ধাতু চৈত্য বৌদ্ধ বিহারে প্রয়াত চন্দ্রমনি মহাস্থবির এর অন্তেষ্টিক্রিয়ার ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আসা লোকজনের উপড় গাড়ি চাপা দিলে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলে ৭ জনের মৃত্যু হয় এবং গুরুতর আহতদের খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রাম হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। এদের মধ্যে মহালছড়ির চৌংড়াছড়ি গ্রামের ৬জনের মৃত্যু হয়। এঘটনায় মাটিরাঙা থানায় মামলা দায়ের হয়েছে। ঘাতক ট্রাক হেলপার সুমনকে আটক করেছে পুলিশ।