Opu Hasnat

আজ ২০ এপ্রিল শুক্রবার ২০১৮,

ব্রেকিং নিউজ

বদলী হওয়ার সময় মানুষ যেন বলে ইস আমাদের এসপি চলে যাচ্ছেন সাক্ষাৎকাররাজবাড়ী

বদলী হওয়ার সময় মানুষ যেন বলে ইস আমাদের এসপি চলে যাচ্ছেন

রাজবাড়ী জেলার আইন শৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করা এবং সবার জন্য আইনের ‘সমান অধিকার’ প্রতিষ্ঠার যে ব্রত নিয়ে পুলিশ সুপার হিসেবে এসেছিলেন জিহাদুল কবির পিপিএম, তার সমাপ্তি টানার সময় এসে গেলো অবশেষে। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর নিয়ম মেনে, সকল আবেগের ঊর্দ্ধে উঠে বিদায় নিতে যাচ্ছেন রাজবাড়ী জেলার সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা প্রজাতন্ত্রের এই কর্মকর্তা। 

আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হয়েও শুধু নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে যে মানুষটা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে এসেছিলেন মানুষের অনেক কাছে, তার বিদায়ে রাজবাড়ীবাসী আবেগতাড়িত। তিনি নিজেও কী নন ? কী করে গেলেন, আরও কী করতে পারতেন কিংবা আর কী করার স্বপ্ন ছিলো তার। এ সবই জানতে চাওয়া হয়েছিলো সদ্য বিদায়ী এই পুলিশ সুপারের কাছে। এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি জানালেন, তার চাওয়া-পাওয়া আর অপ্রাপ্তির গল্প।

 তিনি জানালেন রাজবাড়ীতে আশার পর এখানে ভাল পরিবেশ পেয়েছি, ভাল ছিলাম। রাজবাড়ী জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেক ভাল। অন্যান্য জেলার চাইতে এখানে রাজনৈতিক সহমর্মিতা উল্লেখ করার মতো। তেমন কোন বাঁধা বিঘœ নেই। এ জেলায় দু’টি চ্যালেঞ্জ ছিলো; চরমপন্থী আর দৌলতদিয়া ঘাটকেন্দ্রিক অপরাধ। সেক্ষেত্রে আমি বলবো, ঘাট কেন্দ্রিক অপরাধ প্রশমন করা গেছে। দালাল চক্রের সিন্ডিকেটগুলোও গুড়িয়ে দেয়া সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে চরমপন্থীদের ব্যাপারে একের পর এক অভিযান অব্যাহত রাখা হয়েছে। পুলিশের সাথে বন্দুক যুদ্ধে ৭ চরমপন্থী নিহত হয়েছে। আরও কিছু আহত হয়েছে। বলা যায়, এতে করে ওদের দৌরাত্ব কমেছে। এখন পরিবেশ পুলিশের নিয়ন্ত্রণে আছে বলেই আমি মনে করি। আমার বিশ্বাস, এ ধারা অব্যাহত রাখা গেলে চরমপন্থীরা আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না।

সত্যি বলতে, আমি পুরোপুরি সন্তুষ্ট নই। প্রথমত দৌলতদিয়া পতিতা পল্লীতে কিছু কাজ করতে চেয়েছিলাম। সেটা সম্ভব হয়নি। সেখানে এখনো মাদকের আনাগানা আছে। তবে জুয়া খেলার উপর নিয়ন্ত্রণ করা গেছে। জেলা পুলিশের পাশাপাশি এনজিওদের মাধ্যমে ওই এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়ন আরো ভূমিকা রাখার ইচ্ছা ছিল।

রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া পতিতা পল্লী এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায় আনার ইচ্ছা ছিল। সে চেষ্টা এখনো সফল হয়নি। ওই এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা সম্ভব হলে অপরাধ শূণ্যের কোটায় নামিয়ে আনা সম্ভব।

এগুলো কোন ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। যদি অফিসার থেকে শুরু করে পুলিশের সর্বস্তরের সদস্যদের দিয়ে কাজ করাতে চান তবে তাদের বুকে ধারণ করতে হবে। তাদের বিশ্বস্থ হতে হবে। তবেই না তারা কাজ করবে। ফেসবুক ও মুঠোফোনের মাধ্যমে সিনিয়র অফিসার ও সহকর্মীদের সাথে আলোচনা করেছি। তারা কিভাবে সাধারণ মানুষ, কর্মকর্তা ও ফোর্সদের কল্যানে কাজ করেন তা শুনেছি। যার মধ্য থেকে এ জেলার সাধারণ মানুষ, পুলিশ অফিসার ও অন্যান্য পুলিশ সদস্যদের কল্যানে যে সব কাজ করলে ভাল হয় তাই করার চেষ্টা করেছি।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে পুলিশিংয়ে অনেক পরিবর্তন এসেছে। পুলিশ যত বেশি মানুষের কাছাকাছি যাবে তত বেশি ভাল হবে। সামাজিক জীব হিসেবে আমিও চেষ্টা করেছি মানুষের কাছাকাছি যেতে, সু-সম্পর্ক গড়ে তুলতে। যার অংশ হিসেবে জেলায় কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম জোরদার করেছি। প্রায় প্রতিটি এলাকায় গিয়ে সরাসরি মানুষের সাথে মিশেছি। সাধারণ মানুষ কোন বাঁধা বিঘ্ন ছাড়াই আমার অফিসে আসতে পেরেছে, সমস্যা নিয়ে কথা বলতে পেরেছে এবং তাদের সমস্যার সমাধানও পেয়েছে।

রাজনৈতিক ব্যক্তিরা যখন দেখেন কোন সিদ্ধান্ত ব্যক্তিস্বার্থে নেয়া হয়েছে, তখনই তারা বাড়াবাড়ি করেন। আর যখন তারা দেখেন আইনকে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তখন আর সেটা সম্ভব হয় না। আমি চেষ্টা করেছি রাজনৈতিক ইস্যুগুলো আইনকে সামনে রেখে  সমাধান করতে। ফলে খুব বেশি ছাড় দিতে হয়েছে বলে আমি মনে করিনা।

পুলিশ একক ভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না। তাই সাধারণ মানুষ, জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দদের সাথে সু-সম্পর্ক রেখেই কাজ করতে হয়। আমি চেষ্টা করেছি এসব স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে সু-সম্পর্ক রেখে আইনের মাধ্যমেই সমাধান খুঁজতে।

যেখানে পাচ্ছি সেখানে যোগদানের পর পরিকল্পনার কথা ভাববো। স্বপ্নতো আছেই। আমি যখন সেখান থেকে অন্য কোথাও বদলি হবো, তখন তারাও যেন আফসোস করে বলেন “ইস, আমাদের পুলিশ সুপার বদলী হয়েছেন!” 

রাজবাড়ীতে থাকা কালীন সবচেয়ে ভাল লেগেছে রাজবাড়ীবাসীর ভালবাসা। এছারাও নৃত্যশিল্পী কালু ও তার দলের কাজগুলো ছিল ব্যতিক্রমী। মনে রাখার মতো।

আমি শুরু থেকেই স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে রাজবাড়ীতে অবস্থান করেছি। ছেলে-মেয়ে তো এখানকার স্কুলেই পড়াশোনা করেছে। তাদের নতুন নতুন বন্ধু তৈরী হয়েছে। তারা রাজবাড়ীকে উপভোগ করেছে। ফলে তারাও রাজবাড়ীকে মিস করবে। আমি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষের কবিতার তিনটি লাইন উচ্চরণ করছি,

“কোনদিন কর্মহীন পূর্ণ অবকাশে- বসন্ত বাতাসে-অতীতের তীর হতে যে রাত্রে বহিবে দীর্ঘশ্বাস” সবশেষে সকলের কাছে দোয়া প্রার্থনা করেন বিদায়ী এই পুলিশ সুপার।