Opu Hasnat

আজ ৩০ মে শনিবার ২০২০,

খাগড়াছড়িতে নিউমোনিয়া পরিস্থিতির অবনতি, নিহত ১ স্বাস্থ্যসেবাখাগড়াছড়ি

খাগড়াছড়িতে নিউমোনিয়া পরিস্থিতির অবনতি, নিহত ১

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় নিউমোনিয়া রোগে আক্রান্ত পরিস্থিতির ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গত ২৪ ঘন্টায় নতুন করে আরো ২১শিশু নিউমোনিয়া আক্রান্ত হয়ে খাগড়াছড়ি আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। আশংকাজনক অবস্থায় তিন শিশুকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। হঠাৎ করে নিউমোনিয়া রোগী আর্বিভাব বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সরা হিমশিম বেগ পেতে হচ্ছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে জায়গা না হওয়ায় অনেক অবিভাবক তাদের রোগাক্রান্ত শিশুদের নিয়ে বারান্দায় ও ফ্লোরে আশ্রয় নিয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় কম বয়সী চিকিৎসারত শ্বাস কষ্টের রোগী মো: সিদ্দিক হোসেন নামে মারা গেছে।

প্রতি মূহুর্তে নিউমোনিয়া রোগী আসতে থাকায় শিশু ওয়ার্ডে জায়গা সংকুলান নেই। তাই চিকিৎসার জায়গা হয়েছে বারান্দায় ও নিচে ফ্লোরে। ফলে চিকিৎসা নিতে এসে আরো গন্ধ ও অপরিস্কারের কারনে অসুস্থ্য হয়ে পড়েছে অধিকাংশ শিশুরা। সে সাথে বাড়তি ঝামেলা যোগ হয়েছে পর্যাপ্ত ডাক্তারের প্রকট সংকট।

খাগড়াছড়ি আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালের রেজিষ্টার খাতা ঘেটে দেখা গেছে, বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত গত ২৪ঘন্টায় খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালের আউট ডোরে প্রায় ৫৫৮জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছে। রোগীদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু ও শ্বাস কষ্টের। শুক্রবার সন্ধ্যায় উপজেলা সদর গন্জ পাড়ার নিবাসী কম বয়সী চিকিৎসারত শ্বাস কষ্টের রোগী মো: সিদ্দিক হোসেন(২৩) মারা গেলে আত্মীয় স্বজনদের আহাজাড়ী করতে দেখা গেছে।  

খাগড়াছড়ি আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে দায়িত্ব থাকা সিনিয়ার ষ্টাফ নার্স মনোবিকা চাকমা জানান, বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত নতুন করে নিউমোনিয়া রোগে আক্রান্ত শিশু ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে আবস্থা আশংকাজনক হওয়ায় তিনজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে।

খাগড়াছড়ি আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা: রাজেন ত্রিপুরা জানান, খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে রোগীদের মধ্যে ৯০ভাগই শিশু শ্বাস কষ্টের রোগী। তবে এখন পর্যন্ত কেউ মারা যায়নি।

খাগড়াছড়ি সিভিল সার্জন ডা: নিশিত নন্দী মজুমদার বলেন, অতি বৃষ্টি ও তাপমাত্রা উঠা-নামা করার কারণে হঠাৎ করে নিউমোনিয়ার রোগের প্রকোপ বেড়েছে। তবে এখন পর্যন্ত প্রাণ হানির ঘটনা ঘটেনি। চিকিৎসকরা শিশুদের বৃষ্টির পানি ও গরম থেকে শিশুদের দূরে রাখার জন্য অভিবাবকদের পরামর্শ দিয়েছেন।

খাগড়াছড়ি ১শয্যার আধুনিক হাসপাতালে ডাক্তার সংকটের পাশাপাশি নোংরা পরিবেশ অধিকাংশ রোগীদের আরো অসুস্থ করে তুলছে সচেতন মহলেরা জানান।

এদিকে সচেতন নাগরিক কমিটি(সনাক)’র উদ্যোগে আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালের স্বাস্থ্য সেবার মানোন্নয়নে হাসপাতল কতৃপক্ষের সাথে সনাক প্রতিনিধি দলের মতবিনিময় সভা আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত বুধবার খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার সিভিল সার্জন ও হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. নিশিত নন্দী মজুমদার এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় সনাক প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন সনাক’র খাগড়াছড়ির সহ-সভাপতি মো: জহুরুল আলম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সনাক সদস্য ও জাবারাং কল্যান সমিতির নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা, বিশিষ্ট নারী নেত্রী ও খাগড়াপুর মহিলা কল্যান সমিতির নির্বাহী পরিচালক শেফালিকা ত্রিপুরা, আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা: নয়ন ময় ত্রিপুরা, গাইনি কনসালটেন্ট ডা: জয়া চাকমা, কনসালটেন্ট শিশু ডা: রাজেন্দ্র ত্রিপুরা, মেডিক্যাল অফিসার ডা: রাজর্ষি চাকমা, নার্সিং সুপারভাইজার জুরান মনি চাকমা, অফিস সহকারী যৌবনা চাকমা, অফিস সহকারী রেম্রুচাই মারমা, টিআইবি-র এরিয়া ম্যানেজার তৌহিদুল ইসলাম, এসিস্টেন্ট ম্যানেজার অনুপ কুমার রায় ও ইয়েস দলের সদস্য বৃন্দ।

টিআইবি-র এরিয়া ম্যানেজার তৌহিদুল ইসলাম এর স্বাগতিক বক্তব্যের মধ্যদিয়ে শুরু হওয়া মতবিনিময় সভায় হাসপাতালের বর্তমান সমস্যাসহ সার্বিক চিত্র তুলে ধরে সূচনা বক্তব্য প্রদান করেন সিভিল সার্জন ডা: নিশিত নন্দী মজুমদার। এরপর আলোচনা আহবান করলে আলোচনায় অংশ গ্রহন করেন ইয়েস সদস্য জেকি চাকমা, ফারজানা আকতার, আব্দুর রহিম বাদশা, শেফালিকা ত্রিপুরা, মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা, মো: জহুরুল আলম, সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল-মামুন, রেম্রুচাই মারমা, ডা: সঞ্জীব ত্রিপুরা, ডা: জয়া চাকমা, আরিফুর রহমান, গোপাল চন্দ্র মন্ডল, অরুন বিকাশ চাকমা প্রমুখ। বক্তারা বিগত সময়ের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করার জন্য সিভিল সার্জনকে ধন্যবাদ জানিয়ে আরো কিছু সমস্যা উপস্থাপন করেন।

পর্যায় ক্রমে উপস্থিত সবাই বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন উত্তাপিত বিষয় গুলো যথাক্রমে মহিলাদের জন্য আলাদা ব্রেষ্ট ফিডিং কর্নার চালু, সেবা দাতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা, আলাদা এএনসি কর্নার চালু, নির্যাতনের স্বীকার নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও সাটিফিকেট প্রদানে ব্যক্তিগত লোভ লালসার উর্ধ্বে থেকে কাজকরা, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা আহ্বান, সেবার রশিদ প্রদান, নার্সদের দূর ব্যবহার এর ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহন, দায়িত্বকালীন সময়ে সেবা দাতাদের ইউনিফর্ম ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়ে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষন করে বক্তব্য প্রদান করেন।  

পরিশেষে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার সিভিল সার্জন ও হাসপাতালের তত্ত্ববধায়ক ডা. নিশিত নন্দী মজুমদার এর প্রতি সনাকের পক্ষ থেকে চলমান সমস্যার দ্রুত সমাধানে ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহনের জন্য কার্যকর সহযোগীতা প্রত্যাশা করেন এবং প্রয়োজনে সনাকের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সকল সহযোগিতা করা হবে বলে জানান।

সভায় বেশকিছূ গুরুত্বপূর্ন সিদ্ধান্ত গ্রহনের ফলে উপস্থিত সকলের সহযোগীতায় আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালকে চিকিৎসা সেবার মডেল হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন উপস্থিত সনাক প্রতিনিধি বৃন্দ ও সিভিল সার্জন।