Opu Hasnat

আজ ৭ জুলাই মঙ্গলবার ২০২০,

মুন্সীগঞ্জে মাঠে-ঘাটে সোনার আলু তোলার ধুম কৃষি সংবাদমুন্সিগঞ্জ

মুন্সীগঞ্জে মাঠে-ঘাটে সোনার আলু তোলার ধুম

গোল আলু তো নয় কৃষকের কাছে এ যেন একেকটি গোলাকার সোনা। গোল সোনার জেলা মুন্সীগঞ্জে এখন চলছে আলূ তোলার ধুম। কৃষককুল আলু তোলায় বেজায় ব্যস্ত মাঠে। 

আলু তোলার শেষ সময়ে জেলার মাঠে সারি সারি আলু তোলার পর বস্তাবন্দি করা থেকে শুরু করে কোল্ড ষ্টোরেজ কিংবা বাজারজাত করনে আলু চাষীদের চারপাশে তাকানোর ফুসরত নেই। মুন্সীগঞ্জের ঘরে ঘরে গোল গোল সোনার আলুর স্তুপ। এবার অনেক মুন্সীগঞ্জে কৃষকদের আলুর ফলন ভালো হয়নি বলে অভিযোগ করেন। তাই কৃষকের চোখে-মুখে খুশির জোয়ার লাগার বদলে  মুখে হাসি ঝিলিকের বদলে ফুটে উঠার বদলে ¤øান হয়ে গেছে। এবার মুন্সীগঞ্জে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশী জমিতে আলু চাষ করা হলেও তারা আমানুরুপ দাম না পাওয়ায় হতাশা বিরাজ করছে কৃষক মালিকদের চোখে-মুখে। 

মুন্সীগঞ্জে এবার বাম্পার ফলন হওয়ায় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। মুন্সীগঞ্জে এবার আলুর বাম্পার ফলনে কৃষকের চোখে স্বপ্নের হাতছানি দিচ্ছে গোল সোনার ওই আলু। সপ্তাহখানেক ধরে মুন্সীগঞ্জ জেলার ৬ টি উপজেলা জুড়ে আলু তোলার উৎসব শুরু হয়েছে। কৃষকের সঙ্গে আলু তোলার কাজে কৃষানী ও শিশুরাও নেমে পড়েছে মাঠে। বাম্পার ফলন তো রয়েছেই, তার সঙ্গে উত্তোলনের শুরুতেই এবার আলুর বেশ ভালো দাম পেলেও শেষের দিকে ভালো দাম পাচ্ছেন না কৃষকরা। তাই তো কৃষকের ঘরে-বাইরে, উঠানে-বিছানায়, হাটে-মাঠে-ঘাটে সর্বত্রই গোল সোনার আলু গড়াগড়ি খাচ্ছে। এবার আলুতে বেশ লাভবান হবেন কৃষকরা-এমন আশায় বুকে বেঁধেছেন জেলার হাজারো আলু-চাষী। 

সরেজমিনে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান, শ্রীনগর ও সদর উপজেলার চরকেওয়ার, মোল্লাকান্দি, আধারা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে- কৃষককুল শেষ সময়ে আলু তোলায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। সদরের চরাঞ্চলের গ্রামে গ্রামে দিগন্ত জোড়া মাঠের পর মাঠ জুড়ে যেন গোল সোনা আলুর সমারোহ। চারপাশে যেদিকে দৃষ্টি পড়ে সর্বত্র শুধুই আলু আর আলুর দৃশ্য পলক চোখে পড়ে। দেখা গেছে- কৃষকরা মাঠের মাটি খুঁড়ে তুলে আনছে একেকটি গোল সোনা। আবার উত্তোলন শেষে মাঠেই গোল সোনার স্তুপ করে রাখছেন। পরে এ গোল সোনা বস্তাবন্দি করে বিক্রির জন্য বাজারজাত করা হবে। আবার কেউ কেউ এখনই বস্তাবন্দি গোল সোনা সংরক্ষনের জন্য কোল্ডষ্টোরেজে নিয়ে যাচ্ছেন। 

জেলার সিরাজদিখান উপজেলার ইছাপুরা গ্রামের চাষী মনির হোসেন জানান, আলু তোলার শুরুতেই আলুর ভালো দাম পাওয়া গেছে। জমি থেকেই ২ মন ওজনের প্রতি বস্তাভর্তি আলু বিক্রি হচ্ছে ৮’শ ৫০ টাকা করে। এ দাম সপ্তাহ খানেক শেষে আরো বাড়বে বলে তারা আশাবাদী। আলুতে এবার পোকার আক্রমন না থাকলেও মাঝখানে হয়ে যাওয়া বৃষ্টিতে আলু প্রায় ১০ ভাগ পচন ধরে গেছে। এতে আমাদের অনেকটাই লোকশান পোহাতে হচ্ছে। অন্যান্য জেলা থেকে আসা শ্রমিকদের ন্যাজ্য পারিশ্রমিক দিতে পারছি না।

তার পরও সরকার যদি এই আলুর দামের বিষয়টা বিবেচনা করে একটু বারানোর ব্যবস্থা করতো তাহলে সোনারংয়ের এ আলু এখন চাষীর সোনালী স্বপ্ন পুরনের পথ দেখবে। 

জেলার টঙ্গিবাড়ী উপজেলার ধামারন গ্রামের আলু চাষী আলম শেখ জানান, এবার আলুতে তারা বেশ ক্ষতির সম্মুক্ষিন হবেন। আলু তোলায় কৃষককুল মাঠেই দিনরাত সময় অতিবাহিত করছে। রাতের ঘুম পর্যন্ত হারাম হয়ে গেছে তাদের। ফলন ভালো হওয়ায় কৃষককুল দিন-রাত মিলিয়ে ২৪ ঘন্টাই ব্যস্ত আলু উত্তোলনে। 

এদিকে, জেলার সিরাজদীখান, লৌহজং, শ্রীনগর, গজারিয়া, টঙ্গিবাড়ী ও সদর উপজেলার প্রতিটি গ্রামেই আলু তোলার মহোৎসব চলছে। বিস্তীর্ণ মাঠে কৃষকদের অবিরাম আলু তোলার দৃশ্য সত্যি অপূর্ব এক চিত্র। সদর উপজেলার চরাঞ্চল মহাখালি ইউনিয়নের রহমান মোললা জানান, এখন  আলু তোলা ৮৫ ভাগ শেষ হয়েছে। মার্চের পুরো মাস জুড়েই এ আলু তোলার মহাউৎসবে মেতে থাকবে কৃষক। পাইকাররা ইতিমধ্যেই আলু সংগ্রহ করতে শুরু করে দিয়েছে। দেশের বৃহদাকার মোকামের পাইকাররা মুন্সীগঞ্জে বিভিন্ন গ্রাম-গঞ্জে মাঠময় ঘুরে বেড়াচ্ছে। মাঠেই পাইকাররা বস্তাপ্রতি (২ মন) ৮’শ ৫০ টাকা থেকে ৯ শত টাকায় আলু কিনে নিচ্ছেন। আলুর বাজার আরো চড়া হবে বলে আলু ব্যবসায়ীরা ধারনা করছেন। বাম্পার ফলন হওয়ায় এবার আলু চাষে খরচের তুলনায় দাম বেশী পাওয়ায় চাষীদের মধ্যে আনন্দ বন্যা বইছে বলে জানিয়েছেন সদর উপজেলার আধারার আলী চাষী আনোয়রি হোসেন তিনি জানান, এবার একেকটি আলু বেশ বড় আকারে হয়েছে কোন পোকা-মাকরের বালাই নেই। সোনালী রং ধরেছে আলুতে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপ-পরিচালক মো: হুমায়ুন কবির জানান, এবার জেলায় আলু উৎপাদনের লক্ষমাত্রা ছিল ৩৭ হাজার ৬ শ হেক্টর। যার লক্ষমাত্রা ছিল ৩৭ লক্ষ ৮ শ ৪০ মেট্রিকটন। যার বিপরিতে আবাদ হয়েছে ৩৮ হাজার ৫ শ ৫০ হেক্টর জমি। জাতীয় পর্যায়ে এবারো ১৯ মেট্রিকটন প্রতি হেক্টর। তবে গত বছর মুন্সীগঞ্জ জেলায় ৩৫ মিট্রিকটন প্রতি হেক্টর আলু উৎপাদন হয়েছে। আমরা আশা করছি এবছরও মুন্সীগঞ্জ জেলায় ৩৫ মিট্রিকটন প্রতি হেক্টর আলু উৎপাদন ছাড়িয়ে যাবে। এ পর্যন্ত জেলায় ৮৫ শতাংশ আলু উত্তোলন হয়েছে। কৃষকরা জমিতেই মনপ্রতি ৪শ ৫০ টাকায় উত্তোলণ করছে। আমাদের এ জেলায় ৬৯ টি হিমাগার রয়েছে। যার ধারণ ক্ষমতা ৫ লাখ ২৪ হাজার ১শ ৯০ মে:টন এবং বাড়িতে কৃষকরা ৩ লাখ মে: টন আলু স্তুপ আকারে সংরক্ষরন করে থাকে। বাকি ৫ লাখ মে: টন আলু কৃষকরা মাঠে ও বাড়িতে রেখেই আস্তে আস্তে বিক্রি করে থাকে। এবার প্রতি কেজি আলু রোপনে কৃসকদের খরচ হয়েছে ৮ টাকা ১১ পয়সা। আর বিক্রি করছেন প্রতি কেজিতে সারে ১০ টাকা করে। সুতরাং গতবারের তুলনায় এবার জেলার আলু চাষি-কৃষকরা ভালই দাম পাচ্ছেন।

তবে কৃষকরা বলছেন সরকার যদি এই আলুর দাম বাড়িয়ে নির্ধারত দাম বেধেঁ দেয় তাহলে ভবিষ্যতে মুন্সীগঞ্জ জেলায় আলুর আবাদ করতে আরো বেশি উৎসাহিত হবে। নয়তো আলুর বদলে অন্যান্য চাষাবাদ করবেন বলে কৃষকরা জানান।